সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির গুঞ্জন, ভ্রাম্যমাণ খামারে স্বপ্ন বুনছেন তিন তরুণ

প্রকাশ :
সংশোধিত :

সরিষার হলুদ ফুলে ভরা মাঠ। চারদিকে মৌমাছির গুঞ্জন। সেই মাঠের এক পাশে তাবু টানিয়ে সারি সারি সাজানো মৌমাছির বাক্স। প্রকৃতির এই দৃশ্যকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তিন তরুণের জীবিকার নতুন অধ্যায়। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চান্দাইকোনা বগুড়া বাজার ও পাবনা বাজার এলাকার বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতের পাশে ভ্রাম্যমাণ মধু খামার পরিচালনা করে সফলতা পেয়েছেন তারা।
খামারটিতে রয়েছে ১৭০টি মৌমাছির বাক্স। প্রতিটি বাক্সে একটি করে রানী মৌমাছি রাখা হয়। তার নেতৃত্বে হাজারো কর্মী মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে উড়ে মধু সংগ্রহ করে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় বাক্স খুলে দিলে মৌমাছিগুলো সরিষা ক্ষেতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদিন মধু সংগ্রহ শেষে সন্ধ্যা নামলেই তারা আবার নিজ নিজ বাক্সে ফিরে আসে। সাত দিন পর পর বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। একটি বাক্স থেকে সপ্তাহে গড়ে দুই থেকে তিন কেজি মধু পাওয়া যায়।
সংগৃহীত মধু বিশেষ ড্রামে প্রক্রিয়াজাত করে বোতলজাত করা হয়। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি মধু বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকায়। এই খামারের মধু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে।
খামারের সঙ্গে ১৫ বছর ধরে যুক্ত মো. রিপন বলেন, মৌচাষ সম্পূর্ণভাবে ফুল ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফুল বেশি হয় এবং মধুও বেশি পাওয়া যায়। তবে চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ফুলের পরিমাণ কম হয়েছে। বছরে ছয় মাস মৌচাষের মৌসুম থাকে। বাকি সময় মৌমাছিগুলোকে বাড়িতে রেখে চিনি ও পানি মিশিয়ে খাওয়ানো হয়।
খামারের সঙ্গী রাকিব জানান, প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার ২০০ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়। ছয় মাসে প্রায় সাত হাজার ২০০ কেজি মধু বিক্রি করে আয় হয়েছে আনুমানিক ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা লাভ থাকে। তিনজন মিলে খামারের কাজ পরিচালনা করেন। তাদের মাসিক খরচ প্রায় ২৫ হাজার টাকা। লাভজনক হওয়ায় পড়ালেখা ছেড়ে তারা এখন পুরোপুরি মৌচাষে মনোযোগী হয়েছেন।
মৌচাষের মৌসুমে তারা দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ করেন। প্রথম মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মুকুল থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হয়। এরপর নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জের সরিষা, দিনাজপুরের লিচু এবং পরে বরিশাল, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও মাদারীপুর এলাকার জিরা, ধনিয়া ও কালোজিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। ভুট্টা ক্ষেত থেকেও মৌমাছি কিছু খাদ্য পায়, তবে সেখান থেকে মধু তুলনামূলক কম পাওয়া যায়।
খামারের কর্তা মঞ্জিল বলেন, বর্তমানে তাদের খামারে ১৭০টি বাক্স রয়েছে। আগামী বছর তা বাড়িয়ে ৩০০টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বছরে ১৭০টি বাক্স থেকে গড়ে ২০ থেকে ৩০ মণ মধু পাওয়া যায়। এ বছর সরিষার ফুল কম হওয়ায় মধুর দাম তুলনামূলক বেশি রয়েছে।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার জানান, উপজেলায় তেল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মৌচাষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় সরিষা ২ হাজার ১৮০ হেক্টর, সূর্যমুখী ০.৫ হেক্টর, পেঁয়াজ ১০৫ হেক্টর, আম ১২৫ হেক্টর এবং লিচু ৫৬ হেক্টর জমিতে মৌ বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। এসব এলাকায় ৩০টি মৌ বাক্স ও ৯টি উদ্বুদ্ধকরণ বাক্স থেকে মোট ২২০ কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে, যার বিক্রয়মূল্য প্রতি কেজি ৬০০ টাকা।
তিনি আরও বলেন, মৌচাষ মধু উৎপাদনের পাশাপাশি পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের ফলন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষক ও উদ্যোক্তারা আরও লাভবান হবেন।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.