বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক চুক্তি
মার্কিন বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির আশায় পোশাক খাত
মার্কিন উপকরণ ব্যবহারে শুল্কমুক্ত সুবিধা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

শিল্প নেতারা বলছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ফলে আমেরিকার কাঁচামাল দিয়ে পোশাক তৈরি করলে এখন কম খরচে সেখানে পাঠানো যাবে। এতে করে আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকায় পোশাক রপ্তানি অনেক বেড়ে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন।
তবে তারা, বিশেষ করে সুতা প্রস্তুতকারক বা স্পিনাররা বলছেন, যেহেতু মার্কিন তুলা বেশি দামি, উন্নত মানের এবং দেশে আনতে দীর্ঘ সময় লাগে, তাই এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ওয়্যারহাউস বা গুদাম স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এর মাধ্যমে উৎপাদনে ব্যবহৃত মার্কিন উৎসের কাঁচামালের সঠিক মূল্যায়ন ও ট্রেসেবিলিটি (উৎস শনাক্তকরণ) নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সোমবার দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা এবং কৃত্রিম তন্তু (ম্যান-মেড ফাইবার) ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ওপর কোনো পারস্পরিক শুল্ক প্রযোজ্য হবে না।
চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলেছে, মার্কিন উপকরণ ব্যবহারের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধার বিধান মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার আরও বাড়াবে।
সংগঠনটি এই সুযোগটি কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে উৎপাদনে ব্যবহৃত মার্কিন কাঁচামালের সঠিক মূল্যায়ন এবং ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছে।
মার্কিন তুলাকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল উল্লেখ করে বিজিএমইএ বলেছে, স্থানীয় স্পিনাররা যদি প্রতিযোগিতামূলক দামে সুতা সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেন, তবে উল্লেখযোগ্য রপ্তানি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি সম্পর্কে তাদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়বে, তবে বাড়ার পরিমাণ নির্ভর করবে মূল্য সংযোজনের শর্তাবলির ওপর।
শুল্ক হ্রাস এবং শুল্কমুক্ত সুবিধাকে ভালো উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করে তিনি এই সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ক্রেতারা ইতিমধ্যেই মার্কিন উপকরণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন এবং আগামী বসন্ত মৌসুমের জন্য কাজের আদেশে (ওয়ার্ক অর্ডার) বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির আশা করছেন, যার উৎপাদন আগামী সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা রয়েছে।
তার বার্ষিক ৩০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানির মধ্যে ১৭৫ মিলিয়ন ডলারই যায় যুক্তরাষ্ট্রে।
বর্তমান কাজের আদেশের কাঁচামাল উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে—যাদের ১৮ শতাংশ শুল্ক রয়েছে এবং যারা স্থানীয় রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছে—আরও বেশি মার্কিন তুলা ও তন্তু ব্যবহারের জন্য উদ্ভাবনী উদ্যোগ প্রয়োজন।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ১ শতাংশ শুল্ক ছাড় বাংলাদেশকে পাকিস্তান, কম্বোডিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সমকক্ষ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
তিনি বলেন, এটি ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো, যতক্ষণ না প্রতিযোগীরা মার্কিন তুলা ও তন্তু ব্যবহার করে একই ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধার চুক্তি করে ফেলে।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, এই চুক্তি সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অব্যাহত সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, "আমরা বিশ্বাস করি, এই ফলাফল গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বর্ধিত মার্কিন বিনিয়োগ এবং প্রথাগত খাতের বাইরে বৈচিত্র্য আনার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, বিধি-বিধানের স্পষ্ট যোগাযোগ এবং অংশীজনদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।"
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, 'রুলস অব অরিজিন' বা পণ্যের উৎস বিষয়ক বিধিমালা এখনো স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও সিন্থেটিক ফাইবার ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা কার্যকরভাবে প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, "যদি রুলস অব অরিজিন স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত করা হয়, তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) এবং বস্ত্র খাত ব্যাপকভাবে লাভবান হবে।"
বিটিএমএ সভাপতির সঙ্গে একমত পোষণ করে সংগঠনটির সাবেক সভাপতি এম মতিন চৌধুরী বলেন, শুল্ক হ্রাস মাত্র ১ শতাংশ হলেও এটি এখনো "তাৎপর্যপূর্ণ"।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.