নির্বাচন ঘিরে উচ্ছ্বাসে ডিএসইতে ২০২৪-এর আগস্টের আশাবাদের প্রতিধ্বনি

উত্থানের আবহে ডিএসই, তবে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের ঘাটতি প্রকট

প্রকাশ :

সংশোধিত :

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পতনের পর সম্ভাব্য বাজার সংস্কার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উচ্চ প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ লাফিয়ে ৫ হাজার ৪২৬ পয়েন্টে ওঠে।

এটি ছিল ৪৩ মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ উত্থান। একই দিনে প্রধান বাজারে লেনদেনের পরিমাণ ২৬১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৪৯০ কোটি টাকায়।

বাজারে উচ্ছ্বাস আরও চার কার্যদিবস অব্যাহত থাকে এবং ওই বছরের ১১ আগস্টের মধ্যে ডিএসইএক্সে আরও ৭৮৬ পয়েন্ট যোগ হয়। সেদিন লেনদেনের পরিমাণ ২৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছে।

সে সময় তালিকাভুক্ত অধিকাংশ শেয়ার জাঙ্ক শেয়ারসহ উল্লেখযোগ্য দরবৃদ্ধি পায়। তবে দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত থাকা ভিত্তিগতভাবে শক্তিশালী ও বাজার-নেতৃত্বাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়ায় বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়।

মৌলভিত্তির শক্তি, সুশাসন, লাভজনক প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির উন্নতির ভিত্তিতে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায় ভিত্তিগতভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর শেয়ারদামে।

দীর্ঘস্থায়ী মন্দাবস্থা এবং ফ্লোর প্রাইস আরোপের কারণে স্থবির থাকা শেয়ারগুলো—যেমন গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস—২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ডিএসইতে ঊর্ধ্বমুখী হয়।

বাজারজুড়ে আশাবাদ বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদেরও ব্লু-চিপ শেয়ারে আকৃষ্ট করে।

তৎকালীন বাজার-সংশ্লিষ্টরা আশা করেছিলেন, অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন আগের কমিশনের বিদায়ের পর বাজার কারসাজি ও শোষণের অবসান ঘটবে।

কিন্তু বাজারের উত্থানে প্রত্যাশিত কারণগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। তার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক উদ্বেগ অব্যাহত থাকায় বাজার দ্রুত আগের অবস্থানে ফিরে যায়।

মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশেকুর রহমান বলেন, “তারল্য সরবরাহে কোনো উন্নতি না হওয়ায় বাজারের পুনরুদ্ধার টেকসই হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “এ কারণেই জাঙ্ক শেয়ারে কৃত্রিম উত্থানের প্রবণতা আবার ফিরে এসেছে।”

অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বাজার সংস্কারের জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্যানেল গঠনের নির্দেশ দেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো তালিকাভুক্তি উৎসাহিত করতে একাধিক সংলাপের আয়োজন করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একটি কোম্পানিও দ্বিতীয়িক বাজারে আসেনি।

গত বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার মাধ্যমে ডিএসইতে আশাবাদের আভাস দেখা গেছে।

লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি সোমবার ও মঙ্গলবার যথাক্রমে ৮২ ও ৮৭ পয়েন্ট যোগ হয়েছে প্রধান সূচকে।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা ২০২৪ সালের আগস্টের বাজার-পরিবর্তনের ধারা এবং এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগের বাজারের গতিপ্রকৃতির মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাচ্ছেন।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর সব ব্লু-চিপ শেয়ারে উত্থান দেখা গেলেও এবারের নির্বাচনের আগে তেমনটি হয়নি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাজারকে এগিয়ে নিয়েছে মূলত ব্যাংক খাতের শেয়ার।

অবাক করার বিষয়, অনেক দুর্বল ব্যাংকের শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর একটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারদর ২৯ ডিসেম্বর থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।

আরেকটি দুর্বল ব্যাংক এবি ব্যাংকের বাজারমূল্যও গত সপ্তাহে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মো. আশেকুর রহমান বলেন, “বিনিয়োগকারীরা হয়তো ভেবেছেন, ব্যাংকগুলোর মালিকরা কোনো না কোনোভাবে সম্ভাব্য নতুন সরকারের ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ।”

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজিবাজার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও অন্তর্বর্তী সরকার ও আগের প্রশাসনের সময়কার চ্যালেঞ্জগুলো এখনও রয়ে গেছে। ইশতেহারে শেয়ারবাজার কারসাজিতে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

আগামী দুই দিনের মধ্যে যে দল সরকার গঠন করবে, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ওপরও জোর দিয়েছে।

গত ১৫ বছরে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ অনুসন্ধান কমিশন গঠনের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।

তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলেও বাজারকে টেকসইভাবে ঊর্ধ্বমুখী করতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগযোগ্য মানসম্পন্ন শেয়ার। বর্তমানে এমন শেয়ারের সংখ্যা এতই কম যে নতুন, ভালো পারফরম্যান্স করা কোম্পানির তালিকাভুক্তি ছাড়া বাজারে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

mufazzal.fe@gmail.com

সর্বশেষ খবর