পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আরএমজি কোম্পানিগুলোর অনীহা

নেপথ্যে কর ও কাঠামোগত কারণ

প্রকাশ :

সংশোধিত :

সেকেন্ডারি মার্কেটের প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক বা আরএমজি কোম্পানিগুলো অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলেও, পুঁজিবাজারে আসার জন্য তাদের কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি।

তালিকাভুক্তির একটি বড় উদ্দেশ্য হলো কর সুবিধা পাওয়া। কিন্তু টেলিকম ও তামাক খাত ছাড়া অন্যান্য খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তুলনায় আরএমজি কোম্পানিগুলোকে (তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত নির্বিশেষে) অনেক বেশি হারে কর দিতে হয়।

অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানি তাদের পরিশোধিত মূলধনের ওপর ভিত্তি করে ২০ থেকে ২২.৫ শতাংশ হারে কর দেয়। কিন্তু মুনাফা করা আরএমজি কোম্পানিগুলোর কার্যকর করের হার ৩০ শতাংশেরও বেশি।

সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক রেজা উদ্দিন আহমেদ এর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।

বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, আরএমজি কোম্পানিগুলোকে রপ্তানি মূল্যের ১ শতাংশ অথবা তাদের মুনাফার ১২ শতাংশ—এই দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ কর দিতে হয়।

উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো কোম্পানির রপ্তানি মূল্য ১০০ টাকা হয়, তবে ব্যাংক রপ্তানি আয় থেকে ১ টাকা কেটে রাখবে, যদি না অর্জিত মুনাফার ১২ শতাংশ ১ টাকার চেয়ে বেশি হয়।

পরিচালনা ও প্রশাসনিক সব খরচ বাদ দেওয়ার পর দেখা যায়, অধিকাংশ কোম্পানির কর-পূর্ব মুনাফা ৩ টাকার বেশি নয়। এর মানে হলো মুনাফার ওপর কর হবে ০.৩৬ টাকা, যা রপ্তানি মূল্যের ওপর হিসাব করা করের (১ টাকা) চেয়ে কম।

তাই, উৎসে কর্তন করা ওই ১ শতাংশ করই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে কার্যকর করের হার দাঁড়ায় ৩৩.৩৩ শতাংশ।

রেজা উদ্দিন আহমেদ বলেন, "তাই পুঁজিবাজারে আরএমজি কোম্পানিগুলোর জন্য কোনো কর প্রণোদনা নেই। এটি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করার অন্যতম প্রধান কারণ।"

তবে, যদি কোনো কোম্পানি ৪ শতাংশ মুনাফা করতে পারে, তবে তার চূড়ান্ত করের হার হবে ২৫ শতাংশ। মুনাফা বেশি হলে আরএমজি কোম্পানিগুলোর কার্যকর করের হার কমে আসবে।

আহমেদ আরও বলেন, "বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ আরএমজি কোম্পানি লোকসানে থাকে। খুব অল্প সংখ্যক কোম্পানিই মুনাফা করে।"

আরএমজি কোম্পানিগুলো যে নগদ প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য, সেটিকে আয় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তা পাওয়া কঠিন। রপ্তানিমুখী কোম্পানিগুলোকে তাদের রপ্তানি মূল্যের ওপর দেড় শতাংশ বা তার বেশি প্রণোদনা দেওয়া হয়।

কিন্তু এই প্রণোদনা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, যেমন—উৎপাদনে মূল্য সংযোজন হয়েছে কি না বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে কি না।

তবে আরএমজি প্রস্তুতকারকরা ক্রেতাদের নির্ধারিত দেশ থেকে আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহারে বাধ্য থাকেন, যে কারণে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নগদ প্রণোদনার জন্য আবেদন করতে পারেন না।

বিটপি গ্রুপের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. মোরশেদুল হক জানান, দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও নিরীক্ষা (অডিট) সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রস্তুতকারকরা প্রণোদনার জন্য আবেদন করতে পারেন।

তিনি বলেন, "প্রণোদনার আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইনও থাকে। তাই প্রণোদনার অর্থ হাতে পেতে প্রায় তিন বছর সময় লেগে যায়।" এছাড়া যেসব কোম্পানি সাব-কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে কার্যক্রম চালায়, তারা রপ্তানি প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য নয়।

এর মানে হলো, অধিকাংশ কোম্পানিই রপ্তানি প্রণোদনার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়।

আরএমজি কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তি থেকে নিরুৎসাহিত করার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মালিকানা হস্তান্তরে মালিকদের অনীহা এবং ইক্যুইটি মার্কেটে সঠিক মূল্যায়নের অভাব।

এছাড়া, আরএমজি কোম্পানিগুলোর সম্পদের ভিত্তি অন্যান্য কোম্পানির মতো শক্তিশালী নয়। এ ধরনের কোম্পানিগুলো মূলত কার্যাদেশ (অর্ডার) এবং এলসি (ঋণপত্র) নির্ভর।

তাই আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিগুলোর সম্পদের বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে।

ইক্যুইটি মার্কেটে স্থিতিশীলতার অভাবে ভালো কোম্পানিগুলোও প্রত্যাশিত বাজারমূল্য পায় না, যা ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসা থেকে বিরত রাখার আরেকটি কারণ।

বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে টেক্সটাইল খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৫৮টি এবং বাজার মূলধনে (মার্কেট ক্যাপ) এই খাতের অংশ ৪ শতাংশের নিচে। বাজার মূলধনে এত নগণ্য অংশের কারণ হলো তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানিগুলোর অধিকাংশই স্বল্প মূলধনী (স্মল ক্যাপ)।

এই খাতের উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কয়ার টেক্সটাইলস এবং এনভয় টেক্সটাইলস। 

mufazzal.fe@gmail.com

সর্বশেষ খবর