লাশের মিছিলে ঈদ মোবারক!

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বাংলাদেশি ঈদ মানেই এক অদ্ভুত জাদুর খেলা। এখানে মানুষ কেবল নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে না, বরং জীবনকে বাজি রেখে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার এক বার্ষিক জুয়ায় মেতে ওঠে। আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থা যখন ভেঙে পড়ে, তখন রাষ্ট্র সেখানে এক পরম উদাসীন দর্শক হয়ে দাঁড়ায়; যেন হাইওয়ে আর নদীপথে লাশের স্তূপ গুনে পরিসংখ্যান বানানোই তার প্রধান কাজ। আমরা মুখে বলি ‘ঈদ আনন্দ’, কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা বলছে এটি আসলে একটি পরিকল্পিত ‘সিস্টেমিক কিলিং’ বা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। প্রতিবছর ঈদ আসে, আর আমাদের মহাসড়ক ও নৌপথগুলো এক বিশাল খোলা গণকবরে রূপান্তরিত হয়। রাষ্ট্রের এই নীরবতা আর অব্যবস্থাপনা এখন সম্মতির নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিকাশমান অর্থনীতির পিচ্ছিল পন্টুন ও সক্ষমতার কঙ্কাল
আমরা যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধি আর মেগা প্রজেক্টের উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছি, তখন সদরঘাটের একটি ছিঁড়ে যাওয়া রশি আমাদের প্রকৃত সক্ষমতার কঙ্কালটা বের করে দেয়। একটি সাধারণ রশি ছিঁড়ে ৫ জন মানুষের প্রাণ চলে যাওয়াকে যখন আমরা কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দিই, তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য এখানে কতটা সস্তা। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যখন যাত্রীভর্তি বাস নদীর পেটে চলে যায় কেবল পিচ্ছিল পন্টুনের কারণে, তখন স্পষ্ট হয় যে আমাদের উন্নয়ন কেবল সাইনবোর্ড আর বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ।
যে পন্টুনে এক ফোঁটা বালি ছিটানো বা ঘর্ষণ নিরোধক ব্যবস্থা রাখার ন্যূনতম দায়বদ্ধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই, সেই রাষ্ট্র কোন মুখে আধুনিকতার গল্পোনায়? এটি দুর্ঘটনা নয়, এটি অবহেলার চরম পরাকাষ্ঠা। তদারকি সংস্থাগুলোর চোখে কি ঠুলি পরা, নাকি তারা এই মৃত্যুর মিছিলকে স্বাভাবিক মেনে নিয়েছে? যেখানে প্রতিটি অনিয়ম আর দুর্নীতি মিলে তৈরি করে একেকটি নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ।
সড়ক নয়, যেন আধুনিক কসাইখানা ও লাইসেন্সকৃত ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’
দেশের হাইওয়েগুলো এখন অদক্ষ চালক আর ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহনের এক উন্মত্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিআরটিএ নামক সংস্থাটি লাইসেন্স বিলি করার ক্ষেত্রে যে নীতি অনুসরণ করে, তা অনেক ক্ষেত্রে ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’ সই করার মতোই ভয়ানক। পরিসংখ্যান বলছে, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে থাকে অদক্ষ চালক এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। একজন চালক ট্রাফিক সাইন চেনে না, লেনের শৃঙ্খলা বোঝে না, কিন্তু সে দিব্যি স্টিয়ারিং ধরে কয়েকশ জীবনের ভাগ্যবিধাতা হয়ে বসে আছে।
কেন এই অযোগ্য লোকগুলো রাজপথে দাপিয়ে বেড়ায়? কারণ পর্দার আড়ালে চলে অর্থ আর রাজনৈতিক প্রভাবের লেনদেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এখন এক ‘নীরব মহামারি’র রূপ নিয়েছে। ঈদ উৎসবের উন্মাদনায় হেলমেটহীন তিন আরোহীর বাইক যখন ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়, তখন সমাজ তাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যায়। কিন্তু আইনের শিথিলতাই কি এদের মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে না?
মুনাফার পাল্লায় সস্তা জীবন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
নৌপথের চিত্র আরও বীভৎস। একটি লঞ্চে যেখানে আইনত শ’খানেক মানুষের জায়গা হওয়ার কথা, সেখানে মুনাফালোভী মালিকরা ক্ষমতার জোরে তিনশ’-চারশ’ মানুষকে গাদাগাদি করে তোলেন। জীবন এখানে মুনাফার কাছে অতি তুচ্ছ। জরাজীর্ণ লঞ্চ, অদক্ষ সুকানি আর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী—এই তিনটি বিষাক্ত উপাদানের মিশেলে মাঝনদীতে তৈরি হয় সলিল সমাধি।
সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্র কেবল লোকদেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করতে জানে। কিন্তু কোনো প্রভাবশালী মালিকের কি কোনোদিন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে? হয়নি। ফলে এই অব্যবস্থাই এখন আমাদের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি লাশের বিনিময়ে মালিকপক্ষের পকেট ভারী হয়, আর রাষ্ট্রের ফাইল বাড়ে; বদল হয় না শুধু মানুষের ভাগ্য।
কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বনাম নিয়তিবাদ
আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনাকে ‘ভাগ্য’ বা ‘তকদির’ বলে সান্ত্বনা খুঁজি। কিন্তু এগুলো মূলত ‘ম্যান-মেড’ বা মানুষের তৈরি দুর্যোগ। একে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ বলাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। যখন একটি বাঁক বিপজ্জনক জেনেও বছরের পর বছর সংস্কার করা হয় না, তখন সেখানে কোনো মৃত্যু হলে তাকে আপনি দুর্ঘটনা বলবেন কীভাবে? উন্নয়ন মানে কেবল পিচঢালা পথ নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। মানুষের চেয়ে যখন সিমেন্ট আর লোহার অবকাঠামো বড় হয়ে দেখা দেয়, তখনই রাষ্ট্র তার মানবিক গুণাবলি হারায়।
সড়ক ও নৌ-নিরাপত্তায় ৫ জরুরি পর্যবেক্ষণ ও দিকনির্দেশনা
সড়ক ও নৌ-চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫টি বিষয় পর্যবেক্ষণ জরুরি। এগুলো হলো- ১. ঈদ উপলক্ষে জোড়াতালি দিয়ে নামানো বাস ও লঞ্চের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া, ২. অদক্ষ চালক এবং ক্লান্ত শরীর নিয়ে একটানা গাড়ি বা লঞ্চ চালানো, ৩. ফেরিঘাটের পিচ্ছিল পন্টুন ও ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ্রোচ রোড, ৪. ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী তোলা পরিবহন মালিকদের মজ্জাগত অভ্যাস, এবং ৫. বিআরটিএ-র লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্বের চেয়ে অর্থ ও প্রভাবের প্রাধান্য।
এই লাশের মিছিল থামাতে হলে কেবল তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না, বরং আমূল পরিবর্তন আনতে হবে ব্যবস্থায়।
প্রথমত, বিআরটিএ-র আধুনিকায়ন ও সংস্কারের মাধ্যমে চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক রিফ্রেসার ট্রেনিং এবং ট্রাফিক আইন বিষয়ক কঠোর পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধির লক্ষে সদরঘাট ও দৌলতদিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে হাই-স্পিড ক্যামেরা এবং সার্বক্ষণিক ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। পাশাপাশি কারিগরি ত্রুটি বা লঞ্চের রশির মতো ছোটখাটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রতিদিন যাচাই করার জন্য বিশেষায়িত 'সেফটি ইন্সপেক্টর' নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া সড়ক ও নদীপথ থেকে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন চিরতরে সরিয়ে ফেলা এখন সময়ের দাবি। সর্বোপরি, সড়ক পরিবহন ও নৌ-নিরাপত্তা আইন অমান্যকারী মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আইনের কঠোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে।
রক্তভেজা উৎসবের শেষ কোথায়?
ঈদ মানে মিলন, কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে ঈদ মানে এখন বিচ্ছেদ আর হাহাকার। উৎসবের রঙে যখন সাধারণ মানুষের তাজা রক্তের দাগ মিশে যায়, তখন সেই রাষ্ট্রকে আর ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ বলা চলে না। প্রাণের বিনিময়ে কোনো জিডিপি বড় হতে পারে না। আমরা প্রিয়জনের কাছে নিরাপদে ফিরতে চাই, উৎসব শেষে মাটির গোরস্তানে যেতে চাই না। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবনের বিনিময়ে আসা তথাকথিত উন্নয়ন কোনোদিন টেকসই হয় না। আমরা চাই নিরাপদ পথ, নিরাপদ যাত্রা এবং রক্তের দাগহীন এক আনন্দময় ঈদ।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.