ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব বনাম মুক্ত আকাশ: ডেটা লোকালাইজেশন ও গ্লোবাল ক্লাউডের নীতিগত সংঘাত

প্রতীকী ছবি।
প্রতীকী ছবি।

প্রকাশ :

সংশোধিত :

একবিংশ শতাব্দীতে 'ডেটা' বা তথ্য কেবল কিছু বাইনারি সংখ্যার সমষ্টি নয়, বরং এটি আধুনিক অর্থনীতির নতুন জ্বালানি। কিন্তু এই জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—রাষ্ট্রের কাছে নাকি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা টেক জায়ান্টদের কাছে? এই প্রশ্নটিই বর্তমানে 'ডেটা লোকালাইজেশন' এবং 'গ্লোবাল ক্লাউড কম্পিউটিং'-এর মধ্যে এক প্রবল নীতিগত ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে, যার কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জটিল সমীকরণ।

ডেটা লোকালাইজেশন হলো এমন এক আইনি বাধ্যবাধকতা, যেখানে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে উৎপাদিত তথ্য সেই রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সংরক্ষিত ও প্রক্রিয়াজাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ থেকে নাগরিকদের তথ্য রক্ষা করা।

রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো কঠোরভাবে এই নীতি অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়ার 'ফেডারেল ল নং ২৪২-এফজেড' অনুযায়ী রুশ নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য অবশ্যই রাশিয়ার সার্ভারে রাখতে হবে। অন্যদিকে, ভারত তাদের 'ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট' (DPDP)-এর মাধ্যমে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয়করণের পথ প্রশস্ত করছে। এর পেছনে প্রধান যুক্তি হলো, স্থানীয়ভাবে ডেটা সংরক্ষিত থাকলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং বিদেশি আইনি জটিলতা (যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ক্লাউড অ্যাক্ট') এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়।

গ্লোবাল ক্লাউড মডেলটি মূলত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। অ্যামাজন (AWS), মাইক্রোসফট (Azure) বা গুগল ক্লাউড তাদের বিশাল অবকাঠামোর মাধ্যমে ডেটাকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখে, যাতে গতি এবং ব্যাকআপ নিশ্চিত হয়। লোকালাইজেশনের ফলে এই দক্ষতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

২০২৬-এর প্রথম প্রান্তিক নাগাদ বিশ্বব্যাপী ডেটাস্ফিয়ারের আকার প্রায় ২০০ জেটাবাইট স্পর্শ করতে চলেছে। এই বিশাল তথ্যের প্রক্রিয়াকরণ যদি কেবল নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়, তবে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের খরচ বাড়বে এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা কমে যাবে। 'ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন ফাউন্ডেশন' (ITIF)-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, ভিয়েতনামের মতো দেশ যদি কঠোর লোকালাইজেশন নীতি গ্রহণ করে, তবে তাদের জিডিপি ১.৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। কারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SME) তখন সস্তায় বিদেশি ক্লাউড সেবা ব্যবহার করতে পারে না, যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেয়।

এই দ্বন্দ্বের তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে। 

আইনি হস্তক্ষেপ ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা

গ্লোবাল ক্লাউড মডেলে ডেটা ঠিক কোথায় সংরক্ষিত থাকে, তা অনেক সময় ব্যবহারকারী নিজেও জানেন না। এর ফলে কোনো অপরাধ তদন্তের প্রয়োজনে তথ্যের দরকার হলে সার্ভারের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে জটিল আইনি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ক্লাউড অ্যাক্ট' (CLOUD Act) অনুযায়ী, মার্কিন কোম্পানিগুলো বিশ্বের যেখানেই তাদের সার্ভার রাখুক না কেন, আদালতের পরোয়ানা থাকলে তারা তথ্য দিতে বাধ্য। এটি অনেক দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ বিদেশি একটি আইন অন্য দেশের সীমানায় থাকা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনাম নিরাপত্তা

মুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ডেটা প্রবাহ বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান শর্ত। তবে বাংলাদেশ বা ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে 'ডেটা কলোনিয়ালিজম' বা তথ্য-উপনিবেশবাদ। আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত ও আচরণগত তথ্য ব্যবহার করে সিলিকন ভ্যালির টেক জায়ান্টরা তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা অন্যান্য প্রযুক্তি উন্নত করছে। অথচ এই তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফলে যে বিপুল লভ্যাংশ অর্জিত হচ্ছে, তার সুফল স্থানীয় অর্থনীতিতে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতা রক্ষাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোপনীয়তা ও নজরদারি

ডেটা লোকালাইজেশন যেমন বাহ্যিক সুরক্ষা দেয়, তেমনি এটি রাষ্ট্রের হাতে নাগরিকদের ওপর নজরদারির অতিরিক্ত ক্ষমতাও তুলে দেয়। তথ্যের ভাণ্ডার যখন স্থানীয় সার্ভারে থাকে, তখন সরকার বা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো সহজেই তা নিয়ন্ত্রণ বা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বিশ্বজুড়ে এক কঠিন অমীমাংসিত সমীকরণ।

বাংলাদেশও এই দ্বন্দ্বে অংশীদার। আমাদের 'ডেটা সুরক্ষা আইন' (ডিএসএ)-এর খসড়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। 'স্মার্ট বাংলাদেশ' হিসেবে আত্মপ্রকাশে ক্লাউড কম্পিউটিং অপরিহার্য, কিন্তু একই সাথে সংবেদনশীল তথ্য (যেমন স্বাস্থ্য বা আর্থিক তথ্য) দেশের বাইরে চলে যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ।

২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ক্লাউড ব্যবহারের হার প্রতি বছর প্রায় ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রয়োজন একটি 'হাইব্রিড অ্যাপ্রোচ'। অর্থাৎ, সাধারণ তথ্যের জন্য গ্লোবাল ক্লাউড উন্মুক্ত রাখা এবং উচ্চ-সংবেদনশীল বা জাতীয় নিরাপত্তার সাথে যুক্ত তথ্যের জন্য স্থানীয় ক্লাউড অবকাঠামো গড়ে তোলা।

ডেটা লোকালাইজেশন বনাম গ্লোবাল ক্লাউডের লড়াইটি আসলে ক্ষমতার লড়াই। একপক্ষ বিশ্বকে একটি ডিজিটাল গ্রামে পরিণত করতে চায় যেখানে সীমানা থাকবে না, অন্যপক্ষ নিজের সীমানার ভেতর তথ্যের মালিকানা বুঝে নিতে চায়। চূড়ান্ত বিচারে কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন হয়ে টিকে থাকতে পারবে না। সমাধানের পথ হলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি 'ডেটা শেয়ারিং ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করা, যা তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবে এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকেও সম্মান জানাবে। ডেটা যদি আধুনিক যুগের স্বর্ণ হয়, তবে সেই স্বর্ণের খনি পাহারা দেওয়ার চেয়ে তার সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করাটাই হবে স্মার্ট অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য।

লেখক: সাকিফ শামীম, এফএসিএইচই, এফএলএমআই

ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার

ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ। 

মতামত লেখকের নিজস্ব। 

সর্বশেষ খবর