ময়মনসিংহ-ভৈরব মহাসড়ক চার লেনের মহাপরিকল্পনায় বদলাবে যোগাযোগ ও অর্থনীতি

প্রকাশ :
সংশোধিত :

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত অর্থনৈতিক করিডর ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ- ভৈরব জাতীয় মহাসড়ক (এন-৩৬০) পূর্ণাঙ্গ চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখতে চলেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এই মহাসড়কটি দ্রুত চার লেনে উন্নীত করতে সার্ভিস রোড, আন্ডারপাস, ওভারপাসসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল এবং ঢাকা-সিলেট অর্থনৈতিক বলয়ের পারস্পরিক যোগাযোগে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোঃ শরীফুল আলম সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও লেটার দেন। ওই চিঠিতে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়কটি ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়ক এবং এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সরাসরি সংযোগ স্থাপনকারী প্রধান ধমনী হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত চার লেনে উন্নীত করার জোর দাবি জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেয়।
প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, “ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়ক (এন-৩৬০) আঞ্চলিক ও জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি ময়মনসিংহ জেলার চারটি এবং কিশোরগঞ্জ জেলার ছয়টি উপজেলার ওপর দিয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট এটিকে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীত করা হয়। বর্তমান বাস্তবতায় সার্ভিস রোড, আন্ডারপাস, ওভারপাস ও পৃথক লেনসহ একটি আধুনিক চার লেন সড়ক নির্মাণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়ক শুধু একটি আঞ্চলিক সড়ক নয়, বরং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবাহের অন্যতম প্রধান ধমনী। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান ও কৃষিপণ্য পরিবহনকারী যানবাহন চলাচল করে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, আখাউড়া স্থলবন্দর এবং তামাবিল স্থলবন্দরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে ময়মনসিংহ বিভাগের সংযোগ স্থাপনে এই মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল—নিকলী, মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ঢাকায় যাতায়াতের জন্য পুরোপুরি ভৈরব-ময়মনসিংহ সড়কের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি এসব অঞ্চলের কৃষিপণ্য, মাছ, দুধ, সবজি ও শিল্পপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও এই মহাসড়ক অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু বর্তমানে সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট, চলাচলে ধীরগতি এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঈদ বা বড় ছুটির সময় এই সড়কে দুর্ভোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদির বলেন, “ভৈরব থেকে ময়মনসিংহ যেতে অনেক সময় তিন-চার ঘণ্টা লেগে যায়। সড়কটি চার লেনে উন্নীত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন বাড়বে, তেমনি মানুষের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।”
ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “এই সড়কে দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বিশেষ করে সরু বাজার এলাকা ও বাঁকগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওভারপাস ও সার্ভিস রোড হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।”
অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, চার লেন সড়ক নির্মিত হলে ময়মনসিংহ বিভাগের পর্যটন, কৃষি ও শিল্পখাতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। গারো পাহাড়, হাওরাঞ্চল, মুক্তাগাছার ঐতিহ্যবাহী পর্যটন এলাকা এবং বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক শিল্প সহজ যোগাযোগের সুবাদে আরও বিকশিত হতে পারে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, “এই সড়কটি অনেক আগেই চার লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন ছিল। সরকারের সময়োপযোগী এই উদ্যোগকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।”
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আতাউর রহমান বলেন, “দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে এটি জাতীয় মহাসড়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় জনগণ মনে করছেন, প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা একটি অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। সেই বিবেচনায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ- ভৈরব মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.