‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫’ এর বাস্তবায়ন স্থগিতের দাবি

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রস্তাবিত মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) মিউচুয়াল ফান্ড পুনর্গঠন নিয়ে শুরুতে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের আপত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন ব্রোকারেজ হাউজ, বিনিয়োগকারী এবং বাজারের বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানও প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের পদক্ষেপ এমনিতেই নাজুক অবস্থায় থাকা পুঁজিবাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, পুঁজিবাজার যখনই ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করে তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বাজার আবার পুরোনো পতনের বৃত্তে ঘুরপাক খেতে থাকে।
‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা, ২০২৫’ বাস্তবায়নের পর এ বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। নতুন বিধিমালার আওতায় বিদ্যমান মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে অবসায়ন (লিকুইডেশন) প্রক্রিয়ার মধ্যে আনা হতে পারে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধ্বস নামতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বিধিমালায় অনেকটা জোর করেই অবসায়নের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে বিনিয়োগকারীদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এই আইনে বলা হয়েছে, দুই তৃতীয়াংশ শেয়ার হোল্ডারদের ভোটে মেয়াদি ফাণ্ডগুলোর রূপান্তর বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। যারা ফান্ডগুলো টিকিয়ে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন তাদের জন্য এখানে তৃতীয় কোনও অপশন রাখা হয়নি। এতে করে যেসব বিনিয়োগকারী দীর্ঘ মেয়াদে ফান্ডে বিনিয়োগ করেছেন তাদের মতামত অগ্রাহ্য করে বিপুল ক্ষতির মুখে ফেলে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা, গৃহিণী, ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নতুন বিধিমালার বিভিন্ন দিক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। ডিবিএ সভাপতি বলেন, ‘এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। সবচেয়ে ভালো হতো যদি সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সংগঠন বিএসইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করা হতো। নতুন কমিশন গঠনের পর সম্পদ ব্যবস্থাপক, কাস্টডিয়ান ও ট্রাস্টিরা আবারও কমিশনের কাছে গিয়ে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫ পর্যালোচনার আবেদন করতে পারেন।’
মেয়াদি ফান্ডগুলোর নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) তুলনায় দীর্ঘদিন ধরে ডিসকাউন্টে লেনদেন হওয়ার সমালোচনার ডিবিএ সভাপতি বলেন, ‘বাজারমূল্য নির্ধারণ হয় চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে, ফান্ড ম্যানেজারদের ইচ্ছায় নয়। বিনিয়োগকারীরা যদি প্রাপ্ত রিটার্নে সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে নীতি নির্ধারকদের কোন অসুবিধা হওয়ার কথা না।’
রশিদ ইনভেস্টমেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন, ‘মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে অবসায়ন করার দরকার ছিল না। এটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। যদি কখনো অবসায়ন করতেই হয়, তাহলে তা অবশ্যই পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতির পর সেটা করা উচিত।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএসইসির এই উদ্যোগের সময়টিও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বর্তমানে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর হাতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার তালিকাভুক্ত শেয়ার রয়েছে। ফলে খাতটি দেশের পুঁজিবাজারে অন্যতম বৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিপুল মিউচুয়াল ফান্ড পোর্টফোলিও যদি হঠাৎ অবসায়ন বা বাধ্যতামূলক পুনর্গঠনের আওতায় আনা হয়, তাহলে দুর্বল ক্রয়চাহিদার বাজারে ব্যাপক সরবরাহ সৃষ্টি হবে, যা শেয়ারদরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। রিসার্চে দেখা গেছে এতে করে বেঞ্চমার্ক ইন্ডেক্স ডিএইএক্স (DSEX) ১৫০০ পয়েন্ট পর্যন্ত সংশোধন হয়ে ৩৯০০ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে এবং আরও লক্ষাধিক বিনিয়োগকারী বাজার থেকে বের হয়ে যাবে।
বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ লাখের বেশি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অর্থ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা আছে। তাদের দাবি, বিনিয়োগকারীরা কখনোই এসব ফান্ডের বাধ্যতামূলক অবসায়ন বা রূপান্তর চাননি। বরং অতীতে এমন উদ্যোগের প্রতিবাদে তারা মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলো ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫’ এর বাস্তবায়ন স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা পূর্বে অনুমোদিত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোকে নতুন বিধিমালার আওতার বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি এবং স্বাধীন বাজারবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.