গণভোটে 'হ্যাঁ' জিতলে 'নোট অব ডিসেন্ট' কি বহাল থাকবে?

প্রকাশ :

সংশোধিত :

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনের একটি বিশেষত্ব হলো ভোটের দিন ভোটাররা শুধু তাদের জনপ্রতিনিধিই নির্বাচন করবেন না, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবেও তাদের মত জানাবেন গণভোটের মাধ্যমে। তাই তো এবারের নির্বাচনকে বাড়তি গুরুত্বের সাথে দেখছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত হয় নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দীর্ঘদিন গণতন্ত্রহীনতার পর এই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশ্চুম্বী। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেপে থাকা দুর্নীতি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে সংস্কারের দাবি উঠতে থাকে সর্বত্র। আর এরই প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় ১১টি সংস্কার কমিশন।

সংস্কার কমিশনগুলো দফায় দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সাথে বৈঠক করে এবং বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব সুপারিশ করে। এর মধ্যে কিছু সংস্কার প্রস্তাব বাস্তুবায়িত হয়েছে এবং কিছু বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।

বিভিন্ন কমিশনের প্রায় ৪৯৮টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সরকার।

গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি 'হ্যাঁ' এর পক্ষে ভোট দেয় তাহলে আগামীতে নির্বাচিত সরকার এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর যদি 'না' এর পক্ষে বেশিরভাগ ভোটার রায় দেয়, তাহলে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না আগামীতে নির্বাচিত সরকার।

তবে এসব সংস্কার প্রস্তাবের কোনও কোনোটিতে রাজনৈতিক দলগুলো 'নোট অব ডিসেন্ট' দিয়েছে। এর মানে হলো নোট অব ডিসেন্টে থাকা প্রস্তাবসমূহ ক্ষমতায় গেলে বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না নির্বাচনে বিজয়ী দল। 
তবে পরবর্তীতে এই নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী নোট অব ডিসেন্ট দিলেও উক্ত দল ক্ষমতায় গেলে এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে যদি গণভোটে বেশিরভাগ ভোটার 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে রায় দেয়।

তবে সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে জলঘোলা কম হয়নি। অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন এটি ভেবে যে, শুধু নোট অব ডিসেন্টের কারণেই হয়ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

তবে গণভোটের বিষয়টি সামনে আসার পর সেই সংশয় কেটে গেছে। কারণ এখন জনগণই রায় দিবে সংস্কার প্রস্তাবে তাদের সমর্থনের বিষয়টি। অর্থাৎ গণভোটে 'হ্যা' জিতলে নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল সেটিও কেটে যাবে।

গনভোটে 'হ্যাঁ' বিজয়ী হলে পরবর্তী সরকার ২৭০ দিন বা নয় মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী এসব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর যদি উক্ত সময়ের মধ্যে তা না করা যায়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংবিধান সংস্কার বিল পাস বলে গণ্য হবে।

বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে প্রচার চালানো হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনেও এটি নিয়ে টানানো হয়েছে ব্যানার। এমনকি দেশের সাধারণ মানুষকেও গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন আগামীতে একটি গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে গণভোটে 'হ্যাঁ' এর পক্ষে ভোট দেয়ার কোনও বিকল্প নেই।

গণভোটে 'হ্যাঁ' বিজয়ী হলে আগামীতে সংবিধানে যেসব পরিবর্তন আসবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাংলা ছাড়াও অন্যান্য ভাষাকেও সংবিধানে স্বীকৃতি দেয়া হবে। বর্তমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। 

এছাড়া নিম্নকক্ষে একটি দলের মোট ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন নির্ধারিত হওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল বিএনপি। তাদের মতে, নিম্নকক্ষের আসন সংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষের সিট নির্ধারণ করতে হবে।

অন্যদিকে সংবিধানের ৮, ৪৮,  ৫৬, ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে আয়োজন করতে হবে গণভোট- এমন বিধানও রাখা হয়েছে সংস্কার প্রস্তাবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের যে সংবিধান রয়েছে সেখানে ২২টি মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। তবে জুলাই সনদে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ গণভোট পাস হলে এই দুইটি বিষয়কেও মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে সংবিধানে।

জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। তবে এই প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল বিএনপি। এছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নের ক্ষেত্রেও এসেছিল নোট অব ডিসেন্ট।

এসব বিষয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেসব সংস্কার প্রস্তাব এনেছে সেগুলো যদি গণভোটে পাস হয় তাহলে আগামীতে বাংলাদেশে নতুন করে ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।"

বর্তমানে গণভোটের বিষয়টি দেশের সর্বত্রই তুমুল আলোচিত। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও চলছে এটির প্রচার। অনেকের মতে, আগামীতে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখবে এই গণভোটের রায়।

সর্বশেষ খবর