বেইলি রোড ট্র্যাজেডি: বন্ধ রাখা হয়েছিল ‘কাচ্চি ভাই’-এর গেট, ২২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

প্রকাশ :
সংশোধিত :

দুই বছর আগে বেইলি রোডের আগুন লেগে ৪৬ জনের মৃত্যুর মামলার তদন্ত শেষে ২২ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগে বৃহস্পতিবার ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্রটি জমা দেওয়া হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা তদন্তের ভিত্তিতে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে আগুন লাগার পর প্রধান ফটক বন্ধ করা হয়। এটি সেখানে আটকা পড়া ব্যক্তিদের বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
“তদন্তে উঠে এসেছে, বিল পরিশোধ ছাড়া কেউ যাতে বের হতে না পারে এমন অনিয়মিত প্রথার অংশ হিসেবে ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং আগুনের মুহূর্তেও তা খোলা হয়নি। ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে না পেরে ঘন ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসরোধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন ও পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান। এ রেস্টুরেন্টেই সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটে।"
আদালতে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম অভিযোগ জমা দেওয়ার তথ্য দেন। বলেন, “১৯ এপ্রিল মামলার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র চলে এসেছে। কিছু প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হবে। সাক্ষী হাজির করে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা হবে।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে বেইলে রোডের গ্রিন কোজি কটেজ এর সাততলা ভবনে ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ যায় ৪৬ জনের। এদের মধ্যে ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশু। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে।
এ ঘটনায় রমনা থানার এসআই মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। থানা পুলিশের হাত ঘুরে এটির তদন্তভার পায় সিআইডি পুলিশ।
মামলার আসামিরা হলেন- চায়ের চুমুক কফিশপের স্বত্ত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক, আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের স্বত্ত্বাধিকারী মো. রমজানুল হক নিহাদ, ম্যানেজার মুন্সি হামিমুল আলম বিপুল, কাচ্চি ভাই, খানাজ ও তাওয়াজ রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী মো. সোহেল সিরাজ, চায়ের চুমুক কফিশপের স্পেস মালিক ইকবাল হোসেন কাউসার, কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার জেইন উদ্দিন জিসান, জেস্টি রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী মোহর আলী পলাশ ও মো. ফরহাদ নাসিম আলীম, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মতিন, ৬ষ্ঠ তলার ম্যানেজার মো. নজরুল ইসলাম খাঁন, মেজবানিখানা রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী লতিফুর নেহার, খালেদ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ও অঞ্জন কুমার সাহা, অ্যামব্রোশিয়া রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী মো. মুসফিকুর রহমান, পিৎজা ইন রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী জগলুল হাসান, স্ট্রিট ওভেন রেস্টুরেন্টের স্বত্ত্বাধিকারী আশিকুর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ তারেক, ফুকো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ, মো. সাদরিল আহম্মেদ শুভ, আদিব আলম, রাফি উজ-জাহেদ ও শাহ ফয়সাল নাবিদ।
তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও মারা যাওয়ায় স্পেস মালিক এ.কে নাসিম হায়দার ও ক্যাপ্টেন সরদার মো. মিজানুর রহমানকে মামলা থেকে অব্যাহতি সুপারিশ করা হয়েছে।
এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে থাকা মো. আনোয়ার হোসেন সুমন ও শফিকুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় জড়িত থাকার সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এজন্য তাদেরও অব্যাহতি সুপারিশ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকালে ১১ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের সবাই জামিনে আছেন। এদের মধ্যে সুমন ও রিমন ছিলেন। বাকি ১৩ আসামি পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী বলেন, “ঢাকার বেইলি রোডের ২ নম্বর গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে একাধিক রেস্টুরেন্ট ও কফিশপ পরিচালিত হয়ে আসছিল।
“তদন্তে জানা যায়, ভবনটির অনুমোদিত নকশা অমান্য করে নবম তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয় এবং আবাসিক অংশসহ পুরো ভবনই বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। অধিকাংশ রেস্টুরেন্ট ও কফিশপের কোনো বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা জরুরি নির্গমন পথ ছিল না।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে এতে বলা হয়, দুর্ঘটনার দিন ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত প্রায় পৌনে ১০টার দিকে ভবনের নিচতলার ‘চায়ের চুমুক’ কফিশপে ব্যবহৃত একটি ইলেকট্রিক কেটলি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ওই সময় ভবনের বিভিন্ন তলার রেস্টুরেন্টগুলোতে বিপুল সংখ্যক ক্রেতা অবস্থান করছিলেন। লিপ ইয়ার উপলক্ষে বিশেষ ছাড় থাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ভিড় ছিল। অনেকেই খাবার খাচ্ছিলেন, কেউ আড্ডা দিচ্ছিলেন, কেউ বিল পরিশোধ করছিলেন, আবার কেউ প্রবেশ বা অপেক্ষায় ছিলেন।
“হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত ধোঁয়া ভরে যায় এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই একযোগে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভবনের অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে কোনো জরুরি নির্গমন পথ ছিল না। মূল সিঁড়িই ছিল একমাত্র ভরসা, যা গ্যাস সিলিন্ডার ও বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত ছিল। ফলে সিঁড়ি দিয়ে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেকেই উপরে ওঠার চেষ্টা করেন, কিন্তু ছাদেও আংশিকভাবে পথ বন্ধ থাকায় তারা সেখানেও আটকা পড়েন।”
অভিযোগপত্রে বলা হয়, “‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টে আগুন লাগার পর প্রধান ফটক বন্ধ হয়ে যায়, যা বের হওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। তদন্তে উঠে এসেছে, বিল পরিশোধ ছাড়া কেউ যাতে বের হতে না পারে এমন অনিয়মিত প্রথার অংশ হিসেবে ফটক বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং আগুনের মুহূর্তেও তা খোলা হয়নি। ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে না পেরে ঘন ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই শ্বাসরোধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন ও পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান। এ রেস্টুরেন্টেই সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটে।”
এছাড়া বিভিন্ন তলায় দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি ইন্টেরিয়র, গ্যাস সিলিন্ডারের উপস্থিতি এবং ছাদে অবৈধ স্থাপনার কারণে খোলা জায়গার অভাব আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয় এবং মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধা দেয়। ফলে ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে অনেকে দিক হারিয়ে ফেলেন এবং বের হওয়ার সুযোগ পাননি বলে তদন্তের বরাতে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়।
এতে অভিযোগ করা হয়, এছাড়া ভবনের মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও রেস্টুরেন্ট পরিচালনাকারীরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি বিধি-নিষেধ অমান্য করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু ঘটে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে ওই ভবনের নিচ তলার ‘চুম্বক’ নামের রেস্টুরেন্টে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের কারণে ভবনটিতে আগুন লাগে এবং প্রচন্ড ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া পুরো ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা রেস্টুরেন্টে আগত নারী, পুরুষ, শিশু আটকা পড়েন।
প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ভবনটির স্বত্ত্বধিকারী এবং ম্যানেজার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট এবং দোকান ভাড়া দেন। রেস্টুরেন্টগুলো যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই রান্নার কাজে গ্যাসের সিলিন্ডার এবং চুলা ব্যবহার করে থাকে।
মামলায় ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়, ভবনটির নিচ তলায় থাকা রেস্টুরেন্টের রান্নার কাজে অবহেলা ও অসাবধানতা মূলকভাবে মজুদ করে রাখা এই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হয় এবং এই আগুনের তাপ ও প্রচন্ড ধোয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে বিভিন্ন ফ্লোরে অবস্থিত রেস্টুরেন্ট ও দোকানে অবস্থানকারী লোকজন আগুনে পুড়ে ও ধোয়া শ্বাসনালীতে ঢুকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান এবং গুরুতর আহত হন।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.