যেভাবে শুরু লাহিনীর পোড়া পাউরুটি আর মালাই চায়ের যাত্রা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

চায়ের কাপে ঝড় এই কথাটি আমরা অনেকেই শুনেছি, কিন্তু একটা পোড়া পাউরুটি আর মালাই চায়ের যুগলবন্দি যে পুরো একটা অঞ্চলের পরিচয় বদলে দিতে পারে, তা কুষ্টিয়ার লাহিনীতে না এলে যেন বিশ্বাস করা দায়।
কুষ্টিয়া মানেই লালন সাঁইয়ের একতারা, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি কিংবা মোহিনী মিলের ইতিহাস। তবে খাদ্যরসিকদের মানচিত্রে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন এক তীর্থস্থান। গোধূলি নামলেই লাকড়ির ধোঁয়া আর ফুটন্ত দুধের গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় চারপাশ। এটি কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক ক্যাফে নয়, বরং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্যানাল পাড়ে গড়ে ওঠা একটি চায়ের দোকান, নাম তার ‘জাফর টি স্টল’।
শুরুটা ২০১০ সালে। এক বুক শূন্যতা আর বাবার রেখে যাওয়া লাল চায়ের স্মৃতি, সম্বল করে কুষ্টিয়া পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের লাহিনী পশ্চিমাপাড়ার তরুণ জাফর ইসলাম ধরলেন সংসারের হাল।
ট্রাকের হেলপারি করা সেই অভাবী ছেলেটিই আজ লাহিনীর চায়ের সংজ্ঞাই যেন পালটে দিয়েছে। গড়পড়তা চায়ের দোকানে সচরাচর যা হয়, গরম চা আর সাথে থাকে সাধারণ বিস্কুট বা রুটি। কিন্তু জাফরের মাথায় খেললো অদ্ভুত এক রসায়ন।
কয়লার মৃদু আঁচে চিনি আর মধুর প্রলেপ দিয়ে তিনি সেঁকতে শুরু করলেন পাউরুটি। আগুনের ছোঁয়ায় চিনি গলে যখন রুটির গায়ে লালচে-কালো আভা তৈরি করে, আর কামড় দিলেই জিভে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত ক্যারামেল স্বাদ, ঠিক তখনই জন্ম নেয় লাহিনীর বিখ্যাত এই ‘পোড়া পাউরুটি’।
তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। এই পোড়া রুটির আসল সঙ্গী হলো বিশেষ ‘মালাই চা’। গ্যাসের কৃত্রিম উত্তাপ জাফরের রান্নাঘরে নিষিদ্ধ। এখানে লাকড়ির উনুনে সকাল ৯টা থেকে একটানা গভীর রাত ১টা-২টা পর্যন্ত জ্বলতে থাকে চার-চারটি চুল্লি।
খাঁটি দেশি গাভী থেকে সংগৃহীত দুধ যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই আঁচে ফুটে, তখন তার ওপর জমে এক ঘন, মাখনের মতো সর। জাফর ভাইয়ের কথায়, "৮০ কেজি দুধ কড়া আঁচে জ্বাল দিলে টিকে মাত্র ৫০ কেজির মতো। এই যে ৪০ শতাংশ দুধ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, ওটাই রেখে যায় আসল ঘনত্ব। কোনো কেমিক্যাল বা গুঁড়ো দুধের কারসাজি এখানে খাটবে না। ভালো দুধ ছাড়া কি ভালো মালাই চা হয়?"
এখানে এক কাপ স্পেশাল মালাই চায়ের দাম ৬০ টাকা, সাধারণ চা ৪০ টাকা, আর সেই পোড়া পাউরুটি মাত্র ১০ টাকা। সেই চা পরিবেশন করা হয় নারকেলের মালা দিয়ে তৈরি কাপে।
প্রতিদিন প্রায় চার-পাঁচশো থেকে শুরু করে প্রায় হাজারখানেক পর্যন্ত পাউরুটি আর মণকে মণ খাঁটি দুধের এই যজ্ঞ সামলাতে জাফরের সাথে সঙ্গ দেন আরও ৪-৫ জন কর্মচারী। যার মধ্যে একজন তো গত ১২ বছর ধরে জাফরের সুখে-দুঃখে ছায়ার মতো পাশে আছেন। এছাড়াও ব্যস্ততার দিনে ডাক পড়ে কিছু খণ্ডকালীন কর্মীর।
জাফরের দোকানে কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় একেবারে খাঁটি নিয়মে 'রেগুলার টু রেগুলার', অর্থাৎ দিনশেষে নগদ টাকা হাতে। কাজের ধরন অনুযায়ী কেউ পান দৈনিক ১ হাজার টাকা, আবার কারো হাতে আসে ৫০০-৭০০, আবার কেউ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই কর্মচারীদের বেতন আর অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে জাফরের মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা চলে যায়।
বিকেলের আলো পড়ে আসতেই ক্যানাল পাড়ের এই চত্বরে মানুষের ভীড় বাড়তে থাকে। যশোর, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, মেহেরপুর তো বটেই, দূর ঢাকা থেকেও ঘুরতে এলে, দল বেঁধে আসে শুধু এই স্বাদের খোঁজে। এখন আর শুধু বন্ধুবান্ধবের আড্ডা নয়, প্রায় ৬০ ভাগই আসে সপরিবারে।
দোকানের নিয়মিত চা-প্রেমী মোহসিন উদ্দিনের সাথে কথা বলতেই তার চোখেমুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে তৃপ্তি। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, "আমি তো প্রায়ই এখানে আসি। কত জায়গায় মালাই চা খেয়েছি, কিন্তু লাহিনীর এই চায়ের স্বাদ অন্যরকম। মালাইয়ের ঘন স্তর আর সাথে গরম গরম মিষ্টি পোড়া রুটি - এটা একটা দারুণ মিল। এই স্বাদ না খেলে আসলে বোঝা যাবে না।"
ছুটির দিনগুলোতে ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় জাফর ভাইকে। কখনো কখনো টেবিলে চা পৌঁছাতে দু-চার মিনিট দেরি হলে তরুণদের দল মান-অভিমানও করে। অনেকেই নাকি এখান থেকে দীক্ষা নিয়ে ঢাকার মিরপুরের লাভ রোডে, গাজীপুর ও ৩০০ ফিটে দোকান দিয়েছেন। কিন্তু জাফর ভাইয়ের দাবি, "কুষ্টিয়ার এই খাঁটি দুধের স্বাদ তারা ঢাকায় পাবে কোথায়?"
জাফর ভাই মিরপুর ৬ নম্বরে নিজের একটা জুতসই শাখা খোলার জন্য জায়গাও তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি, শেষমেশ আর যাওয়া হয়নি। খোকসায় যে দ্বিতীয় শাখাটি খোলা হয়েছিল, সেটিও কর্মী সংকট আর সাম্প্রতিক নানান সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে জাফর ভাইয়ের ইচ্ছে, ভবিষ্যতে ঢাকাতেই এই চায়ের রাজকীয় একটি শাখা খুলবেন তিনি। এমনকি কেউ যদি নতুন ব্যবসা করতে চায়, তবে তাকে ১৫ দিনের জন্য ট্রেইনার পাঠিয়ে কাজ শিখিয়ে দেওয়ার দারুণ এক ব্যবসায়িক ভাবনাও করে রেখেছেন তিনি।
জাফর ইসলামের এই অনন্য সৃষ্টি লাহিনীকে যে গৌরব এনে দিয়েছে, তা বলা বাহুল্য। এক কাপ ঘন মালাই চা আর এক টুকরো পোড়া পাউরুটির উছিলায় হাজারো মানুষের যে মেলবন্ধন প্রতিদিন এখানে ঘটে, তা শহুরে রেস্তোরাঁগুলোতে দেখা ভার।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.