যেভাবে 'বোতলে বন্দী বন' দিয়েই লাখ টাকার ব্যবসা করলেন দুই ভাই

প্রকাশ :

সংশোধিত :

শহুরে জীবনে প্রকৃতি যেন এক বিরল বিলাসিতা। চারপাশে শুধু ইট-পাথরের সারি, গাড়ির হর্ন আর মানুষের অবিরাম ছুটে চলা। এই কংক্রিটের ভিড়ে এক টুকরো সবুজ খুঁজে পাওয়া যেন সোনার হরিণের মতোই দুর্লভ। আর তাই, যারা সবুজের ছোঁয়া ভালোবাসেন, তারা এখন ঘরের কোণেই নিজেদের মতো করে বাগান সাজিয়ে নিচ্ছেন। এই শখ থেকেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন শিল্প—'বোতলে বন্দী বন' বা টেরারিয়াম। একটি কাঁচের পাত্রে মাটি, পাথর আর জীবন্ত গাছপালা দিয়ে তৈরি করা হয় ছোট একটি পৃথিবী, যা একদিকে যেমন ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায়, তেমনি দেয় এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি। এটি এখন শুধু শখ নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এটিই এখন একটি সফল ব্যবসার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই গল্পের শুরুটা ছিল তাঁদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা থেকে। সানজিমুল হক অয়ন ও তার যমজ ভাই মুতাসিমুল হক অর্ণব ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়াশোনা করছেন, তারা বুঝতে পারেন যে গতানুগতিক একটি চাকরি করার চেয়ে নিজেদের একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ শুরু করার মধ্যেই তাঁদের প্রকৃত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। তারা চাকরি খোঁজার পরিবর্তে বরং নিজেরাই মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবেন—এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন।

আর সেই স্বপ্নেরই প্রথম বীজ বপন হয় একদিন অর্ণবের ইনস্টাগ্রাম স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে। জাপানিজ টেরারিয়ামের একটি ভিডিও দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, 'একটি ছোট বন কি সত্যিই কাঁচের জারের মধ্যে বানানো সম্ভব?' দেশের বাজারে এমন কোনো পণ্য খুঁজে না পেয়ে তিনি নিজেই এটি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।

কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুরু হয় অর্ণবের গবেষণা। ইউটিউব, বিদেশি আর্টিকেল ও ভিডিও ছিল তার একমাত্র শিক্ষক। শীতপ্রধান দেশের জন্য তৈরি ভিডিওগুলো বাংলাদেশের গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে তিনি প্রথম দিকে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন।

টেরারিয়ামগুলো তৈরি করার পর সেগুলো টিকে থাকছিল না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কৌশল রপ্ত করেন এবং এভাবেই ধীরে ধীরে টেরারিয়ামগুলো স্থিতিশীল হতে শুরু করে।

টেরারিয়াম বানানো শেখার পর আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এর বাজার খুঁজে বের করা। কার কাছে, কীভাবে এই পণ্য বিক্রি করা হবে, তা নিয়ে কোনও ধারণাই ছিল না। ঠিক এই সময়েই অয়ন ও তাদের ছোট ভাই ফাজিন ফুয়াদ মাহিব বুঝতে পারেন যে এটি শুধু একটি শখ নয়, বরং এর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।

তাদের প্রস্তাবে অর্ণব রাজি হন এবং তিনজন মিলে সিদ্ধান্ত নেন এই শখকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার। জন্ম নেয় 'টেরারিয়াম প্যারাডাইস'। এরপর বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা মার্কেটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ওয়েবসাইট ম্যানেজমেন্টের ওপর বিভিন্ন কোর্স করেন। এভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের ব্যবসার একটি শক্ত ভিত তৈরি করেন।

অন্যান্য টেরারিয়াম নির্মাতাদের থেকে নিজেদের আলাদা করতে তাঁরা পণ্যে বৈচিত্র্য আনেন। তাদের টেরারিয়াম প্যারাডাইস-এর তালিকায় আছে কয়েকটি ভিন্নধর্মী সংস্করণ। এর মধ্যে ‘লাইভ টেরারিয়াম’ হলো জীবন্ত গাছপালা ও অণুজীবসহ একটি ছোট বাস্তুতন্ত্র।

যারা শুধু সৌন্দর্য চান, তাদের জন্য আছে ‘জিরো-মস টেরারিয়াম’, যেখানে রাসায়নিক দিয়ে মসকে নিষ্ক্রিয় করে শুধুই শিল্পকর্ম হিসেবে রাখা হয়। বড় পরিসরে প্রকৃতির ছোঁয়া আনতে তৈরি করা হয় ‘ফেলুদারিয়াম’, যার নিচে পানি থাকে এবং সেখানে মাছও রাখা যায়।

এছাড়াও আছে ঘরের পরিবেশকে আরও প্রাকৃতিকভাবে সাজানোর জন্য ‘বাইবারিয়াম’ এবং গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী ‘কাস্টম ডিজাইন’। এই বহুমুখী পণ্যগুলোই তাদের ব্র্যান্ডকে একটি অনন্য পরিচয় এনে দিয়েছে।

আজকের দিনে এই ছোট উদ্যোগটি শুধু একটি ব্যবসা নয়, বরং সৃজনশীলতা আর দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। অয়ন ও তার ভাইদের পরিকল্পনা এখন আরও বড়। তারা কেবল অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেই থেমে থাকতে চান না, বরং সারা দেশে টেরারিয়াম প্যারাডাইস-এর শোরুম খোলার স্বপ্ন দেখেন।

তাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের বাইরে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারেও এই শিল্পকর্ম রপ্তানি করা। বড় বড় কর্পোরেট ক্লায়েন্ট ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ ডিজাইন ও বড় অর্ডার গ্রহণ করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের। সবশেষে, তাঁদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পরিবেশ-বান্ধব হোটেল ও রেস্তোরাঁ তৈরি করা, যেখানে প্রকৃতি আর টেরারিয়ামের একটি নিবিড় সংযোগ থাকবে—যা তাঁদের ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি শিল্পের প্রতি ভালোবাসাকে সার্থক করে তুলবে।

mahamudulhasan1137@gmail.com

সর্বশেষ খবর