ভালোবাসার নামে নির্যাতন: কেন এখনও শাস্তিকে ‘শিক্ষা’ মনে করা হয়?

প্রকাশ :
সংশোধিত :

“একটু মার না খেলে মানুষ হবে না” বাক্যটি আমাদের সমাজে খুব পরিচিত। অনেকেই এটি বলেন তথাকথিত স্নেহের জায়গা থেকে। যেন শাসন মানেই কখনও ধমক, কখনও চড়, কখনও অপমান। শিশু কথা না শুনলে, ভুল করলে, দুষ্টুমি করলে শাস্তি যেন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এখনও শাস্তিকে শিক্ষা মনে করি?
এই ধারণার পেছনে আছে দীর্ঘ সামাজিক অভ্যাস। বহু পরিবারে বাবা-মা নিজেরাও শাস্তি পেয়ে বড় হয়েছেন। তাদের মনে হয়েছে, “আমাদেরও তো মারা হয়েছে, তবু মানুষ হয়েছি।” ফলে শাস্তি শুধু আচরণ নয়, হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার। এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে দিয়ে যায় একই পদ্ধতি।
সমস্যা হলো, শাসন আর শাস্তি এক জিনিস নয়।
শাসন হতে পারে সীমা শেখানো, দায়িত্ব বোঝানো, ভুল হলে বোঝানো। কিন্তু শাস্তি অনেক সময় ভয় দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা। আর ভয় দিয়ে শেখা জিনিস গভীরে ক্ষত রেখে যেতে পারে।
একটি শিশু যদি ভুল করলেই অপমানিত হয়, মার খায়, সবার সামনে ছোট হয় তাহলে সে কী শেখে? সে কি সত্যিই ভালো আচরণ শেখে, নাকি শিখে ভয় পেতে? শিখে লুকাতে? শিখে শক্তিশালীর সামনে চুপ থাকতে?
শিশু অধিকারকর্মীরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, শাস্তি অনেক সময় আচরণ ঠিক করে না, বরং শিশুর ভেতরে রাগ, লজ্জা, অনিরাপত্তা আর আত্মবিশ্বাসহীনতা তৈরি করে।
এই পর্যবেক্ষণের পক্ষে আন্তর্জাতিক গবেষণাও আছে। মার্কিন গবেষক এলিজাবেথ গারসহফ দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখিয়েছেন, শারীরিক শাস্তি শিশুদের আচরণে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক ফলের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেয় না; বরং নানা ধরনের ক্ষতির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। (তথ্যসূত্র: Elizabeth Gershoff, corporal punishment research; Nature Human Behaviour, ২০২৫)
তবু সমাজে শাস্তি গ্রহণযোগ্য কেন?
একটি বড় কারণ আমরা শাস্তিকে ফল দিয়ে বিচার করি, প্রক্রিয়া দিয়ে নয়।
একজন ছাত্র কঠোর শাসনে ভালো ফল করল আমরা বলি, “দেখো, মারধর না করলে মানুষ হতো না।” কিন্তু কেউ দেখে না, তার ভেতরে কী ভয় জমেছে। আমরা বাহ্যিক সাফল্য দেখি, ভেতরের ক্ষত দেখি না।
আরেকটি কারণ শাস্তিকে আমরা ভালোবাসার বিপরীত ভাবি না।
“তোমার ভালোর জন্য মারছি” এই বাক্যটি আমাদের সমাজে খুব পরিচিত। উদ্দেশ্য ভালো হলেই পদ্ধতি নিরাপদ হয় না এই সহজ সত্য আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। বরং এই ভাষা সহিংসতাকে নৈতিক বৈধতা দেয়।
এই বৈধতা শুধু পরিবারে নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও দেখা যায়। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা আছে, অনেক জায়গায় এখনো অপমান, দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে ওঠবস, সবার সামনে ছোট করা এসবকে শাস্তি নয়, ডিসিপ্লিন বলা হয়। শব্দ বদলালেও অভিজ্ঞতা বদলায় না।
ভাষা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
“মার” না বলে “শাসন” বললে তা কোমল শোনায়। “অপমান” না বলে “শিক্ষা দেওয়া” বললে তা গ্রহণযোগ্য লাগে। অনেক সময় শব্দ বাস্তবতাকে আড়াল করে।
কিন্তু গবেষণা বলছে, এই স্বাভাবিকীকরণ প্রশ্নহীন নয়। শিশু বিকাশ গবেষক হোর্হে কুয়ার্তাস-এর সহলেখকত্বে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক মেটা-বিশ্লেষণে ৯২টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শারীরিক শাস্তির সঙ্গে ইতিবাচক ফলের প্রমাণ মেলেনি; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাবের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। (তথ্যসূত্র: Jorge Cuartas et al., Nature Human Behaviour, ২০২৫)
এই পর্যবেক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে শাস্তি হয়তো বাধ্যতা আনে, কিন্তু তা শেখা বা সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করে না।
তাহলে কি কোনো সীমা থাকবে না? শিশুকে যা খুশি করতে দেওয়া হবে?
এই প্রশ্নও ওঠে। কিন্তু শাস্তির বিকল্প মানে নিয়ন্ত্রণহীনতা নয়। বরং ইতিবাচক শৃঙ্খলা। যেখানে শিশুকে বোঝানো হয়, কথা বলা হয়, বয়স অনুযায়ী নিয়ম তৈরি করা হয়, ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়।
ধরা যাক, শিশু পড়েনি। তাকে অপমান না করে বোঝা যেতে পারে কেন পড়েনি চাপ, ভয়, অমনোযোগ, না কি অন্য কোনও সমস্যা? সমস্যা বুঝে সমাধান করা আর শাস্তি দেওয়া দুটি ভিন্ন পথ।
অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক যত নিরাপদ হয়, শেখা তত কার্যকর হয়। ভয় অল্প সময়ের জন্য বাধ্যতা আনতে পারে, কিন্তু সম্মান দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ববোধ গড়ে।
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমানো দরকার এই কথার মানে শুধু আইন করা নয়, ভাবনা বদলানো।
কারণ অনেক সময় সমাজ এমনভাবে গড়ে ওঠে, যেখানে শাস্তি না দিলে অভিভাবককে “দুর্বল” ভাবা হয়। শিক্ষক কঠোর না হলে “ক্লাস সামলাতে পারেন না” বলা হয়। অর্থাৎ সহিংসতা শুধু ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়, সামাজিক চাপেরও ফল।
এই চাপ বদলাতে দরকার কথোপকথন। প্যারেন্টিং নিয়ে প্রশিক্ষণ, স্কুলে ইতিবাচক শৃঙ্খলা পদ্ধতি, গণমাধ্যমে সচেতনতা এসব জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিশুদের অভিজ্ঞতা শোনা।
আমরা খুব কমই শিশুদের জিজ্ঞেস করি, শাস্তি পেলে তারা কেমন অনুভব করে। যদি জিজ্ঞেস করি, হয়তো অনেক উত্তর আমাদের অস্বস্তিতে ফেলবে। হয়তো কেউ বলবে, “ভুল করলে আমি ভুলকে না, বাবাকে বেশি ভয় পাই।” এই একটি বাক্যই যথেষ্ট ভাবার জন্য। শিশুকে মানুষ বানানো কি ভয় দিয়ে সম্ভব, নাকি বিশ্বাস দিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তরই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে। হয়তো সময় এসেছে “মার না খেলে মানুষ হবে না” এই বাক্যকে সত্য ধরে নেওয়ার বদলে প্রশ্ন করার। কারণ, মানুষ হওয়া যদি সহমর্মিতা শেখা হয়, সম্মান শেখা হয়, নিরাপদ সম্পর্ক শেখা হয় তাহলে সেই শিক্ষা সহিংসতার ভেতর দিয়ে আসে কীভাবে?
ভালোবাসার নামে যা স্বাভাবিক হয়ে গেছে, সবই যে ন্যায়সঙ্গত তা তো নয়।
অনেক সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়েছে ঠিক এমন জায়গা থেকেই, যেখানে মানুষ প্রথমবার বলেছে—“এটা তো আমরা স্বাভাবিক ধরে নিয়েছিলাম, কিন্তু আসলে কি তা স্বাভাবিক?”
শিশুদের শাস্তি নিয়েও হয়তো আমাদের সেই প্রশ্নটাই নতুন করে করা দরকার।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.