
প্রকাশ :
সংশোধিত :

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল বন্দুকধারী যোদ্ধাদের গল্প নয়; এটি অসংখ্য সাধারণ মানুষের অসাধারণ সাহস, ত্যাগ ও আত্মদানের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে নারীদের অবদানও অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এমনই এক সাহসী নারী ছিলেন লুৎফুন্নাহার হেলেন। মাগুরার এক মেধাবী শিক্ষিকা, রাজনৈতিকভাবে সচেতন সংগঠক এবং মুক্তিযুদ্ধের এক অদম্য কর্মী। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে তার জীবন ও সংগ্রাম নতুন করে মনে করিয়ে দেয় যে বাংলার নারীরা কেবল ঘরের ভেতর নয়, ইতিহাসের বড় বড় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
শৈশব, শিক্ষা ও জাগ্রত চেতনা
১৯৪৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর মাগুরায় জন্মগ্রহণ করেন লুৎফুন্নাহার হেলেন। তার বাবা মুহাম্মদ ফজলুল হক এবং মা মোসাম্মৎ ছফুরা খাতুন। বড় একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা হেলেন ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। বাবার উৎসাহেই তার মধ্যে বই পড়ার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের বই পড়তে পড়তে তার মধ্যে সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের মুক্তি সম্পর্কে একটি গভীর সচেতনতা তৈরি হয়।
ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি ১৯৬৫ সালে মাগুরা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
পড়াশোনা শেষ করে তিনি মাগুরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা তার কাছে শুধু একটি চাকরি ছিল না; এটি ছিল সমাজকে পরিবর্তন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সাহস জোগায়।
ছাত্ররাজনীতি ও রাজনৈতিক সচেতনতা
ছাত্রজীবনেই হেলেন রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন'–এর মাগুরা অঞ্চলের একজন সক্রিয় নেত্রী ছিলেন এবং মাগুরা কলেজের ছাত্র সংসদের মহিলা কমনরুম সম্পাদিকা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সেই সময় পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং স্বাধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছিল। হেলেনও এই রাজনৈতিক জাগরণের অংশ হয়ে ওঠেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে সাধারণ মানুষকেও সংগঠিত হতে হবে।
মাগুরা শহরে বসবাস করলেও তার গ্রামের বাড়ি ছিল মহম্মদপুর থানার হরেকৃষ্ণপুর গ্রামে। সেই অঞ্চলকে ঘিরে তখন বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর গেরিলা কার্যক্রমও চলত। হেলেন এসব সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতেন। এতে তার রাজনৈতিক চেতনা আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
নারী শিক্ষা ও সমাজে ভূমিকা
শিক্ষক হিসেবে হেলেনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ষাটের দশকে বাংলাদেশের অনেক গ্রাম ও মফস্বলে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা তখনও খুব সাধারণ বিষয় ছিল না। অনেক পরিবার মেয়েদের লেখাপড়া করাতে দ্বিধা করত। সেই সময় একজন তরুণী নারী শিক্ষক হিসেবে তিনি মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করতেন।
তিনি মনে করতেন, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে নারীদের শিক্ষিত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। শিক্ষিত নারী শুধু নিজের জীবনই বদলে দেয় না; সে পুরো পরিবার এবং সমাজকে বদলে দিতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন হেলেন সক্রিয়ভাবে সেই যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং মাগুরা শহর থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
তিনি এলাকার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং সংগঠক হিসেবে কাজ করতেন। তার ভাইয়েরাও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তিনি মাগুরার মহম্মদপুর থানার একটি রাজাকার ক্যাম্প দখল করেন এবং সেটিকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরে রূপান্তর করা হয়। তিনি কার্যত একজন গোপন সংবাদ সংগ্রাহক হিসেবেও কাজ করতেন। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই দায়িত্ব তিনি সাহসের সঙ্গে পালন করেছিলেন।
নির্মমভাবে শহীদ হওয়া
১৯৭১ সালের অক্টোবরের শুরুতে মাগুরার মহম্মদপুর এলাকার একটি গ্রামে অবস্থানকালে রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর গুপ্তচররা তার গোপন অবস্থানের খবর ফাঁস করে দেয়। এরপর রাজাকারদের একটি দল তাকে আটক করে।
সে সময় তার কোলে ছিল দুই বছরের শিশুপুত্র দিলীর। রাজাকাররা শিশুটিকে পরে তার দাদা–দাদীর কাছে ফিরিয়ে দিলেও হেলেনকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। সেনা ক্যাম্পে তাকে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হতে হয়। নির্মম নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করা হয়। এরপর তার মরদেহ জিপের পেছনে বেঁধে শহরের বাইরে নবগঙ্গা নদীর ডাইভারশন ক্যানেলে টেনে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। তার মরদেহ আর কখনও উদ্ধার করা যায়নি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে হেলেন
আজ যখন আমরা আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করি, তখন লুৎফুন্নাহার হেলেনের মতো নারীদের কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন। নারী দিবস মূলত নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার দাবিকে সামনে আনার একটি দিন।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিনটি আমাদের আরও একটি সত্য মনে করিয়ে দেয়—নারীরা শুধু সামাজিক বা পারিবারিক ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় মুক্তির সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
লুৎফুন্নাহার হেলেন ছিলেন সেই নারীদের একজন, যিনি দেখিয়ে গেছেন যে নারী মানেই দুর্বলতা নয়। একজন নারী একই সঙ্গে শিক্ষক, সংগঠক, রাজনৈতিক কর্মী এবং যোদ্ধা হতে পারেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে নারী–পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই।
নারী দিবসের আলোচনায় প্রায়ই নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের কথা বলা হয়। হেলেনের জীবন এই তিনটি ক্ষেত্রেরই একটি শক্তিশালী উদাহরণ। তিনি শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে আলো ছড়িয়েছেন, রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে নেতৃত্বের এক বিরল উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—সমাজের পরিবর্তন শুধু কথায় আসে না; এর জন্য সাহস, দায়বদ্ধতা এবং ত্যাগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই কেবল উদযাপনের দিন নয়; এটি এমন নারীদের স্মরণ করার দিন, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ একটি দেশ রেখে গেছেন।
স্মরণ ও শ্রদ্ধা
বাংলাদেশ সরকার তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তার ছবি সম্বলিত একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এটি ছিল তার আত্মত্যাগের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার একটি প্রতীক। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রজন্মের কাছে লুৎফুন্নাহার হেলেন সাহস, চেতনা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতীক। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই শহীদ বীরকন্যাকে যিনি প্রমাণ করে গেছেন, বাংলার নারীরাও স্বাধীনতার সংগ্রামে সমান সাহসী এবং অদম্য।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.