সমাধিলেখ পরিকল্পনা করার দিন

সুযোগ থাকলে নিজের এপিটাফে কী লিখাতে চান?

ওল সোলস ডেতে, শ্রদ্ধা জানাতে আসা মৃতের আপনজন, খ্রিস্টান কবরস্থান, নারিন্দা।
ওল সোলস ডেতে, শ্রদ্ধা জানাতে আসা মৃতের আপনজন, খ্রিস্টান কবরস্থান, নারিন্দা। ছবি : মো. ইমরান

প্রকাশ :

সংশোধিত :

প্রতি বছর ৬ই এপ্রিল এবং ২রা নভেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় একটি অদ্ভুত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিবস—'প্ল্যান ইয়োর এপিটাফ ডে' বা নিজের সমাধিলেখ পরিকল্পনা করার দিন। এটি এমন এক মুহূর্ত যখন আমাদের সেই চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, যা থেকে আমরা সারা জীবন সযত্নে দূরে থাকতে চাই। কয়েকটি শব্দে গোটা জীবনের সব চাওয়া-পাওয়, ভালো কিবা খারাপ লাগা ব্যক্ত করা কি সম্ভব? শুনতে কিছুটা বিষাদময় বা অদ্ভুত মনে হলেও, জীবনের এই অনিবার্য সমাপ্তিকে হাসিমুখে গ্রহণ করার চমৎকার ও সৃজনশীল উপায় হলো এই দিন। পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও নিজের সম্পর্কে কিছু জানানোর সুযোগ করে দেয় এই দিন।    

জোহানেস ক্যাচিক, এসকোয়ারের কবর যিনি ২২শে ডিসেম্বর, ১৮৪৭ সালে মারা যান। আর্মেনিয়ান চার্চ, আরমানিটোলা, ঢাকা। ছবি- মো. ইমরান 

এই কবরে আর্মেনীয় ও ইংরেজি ভাষায় লিখা, পবিত্র স্মৃতিতে জোহানেস ক্যাচিক, এসকোয়ায়ার, যিনি ২২শে ডিসেম্বর, ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে ইহলোক ত্যাগ করেন, মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১৮ বছর, ৭ মাস এবং ২৪ দিন। তিনি আচরণে নম্র এবং স্বভাবে মহৎ, কর্মে ও কথায় অত্যন্ত প্রীতিভাজন। পরিবারের সকলের প্রিয় ছিলেন তিনি।

পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতিতেই মৃত্যুকে ঘিরে রয়েছে নানা প্রথা ও ঐতিহ্য, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে জন্ম ও মৃত্যুর এই অমোঘ চক্রের সাথে শান্তিতে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করা।

মৃত্যু জীবনের এক ধ্রুব সত্য। এই নশ্বর পৃথিবীতে যার জন্ম হয়েছে, তার মৃত্যুও সুনিশ্চিত। কিন্তু দিনশেষে যা টিকে থাকে, তা হলো আমাদের যাপিত জীবন, আমাদের সংগ্রামের গল্প এবং আমাদের স্মৃতি।

একটি এপিটাফ বা সমাধিলেখ হলো পৃথিবীর বুকে আমাদের সেই শেষ কথাগুলো অমর করে রাখার মাধ্যম। এটি আমাদের সুযোগ করে দেয় চলে যাওয়ার আগে নিজের ভাষায় পৃথিবীকে শেষবারের মতো কিছু বলে যাওয়ার।

এই দিনটির ভাবনা প্রথম মাথায় আসে ল্যান্স হার্ডির, যিনি ১৯৯৫ সালে এটি প্রবর্তন করেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তাদের জীবনের নির্যাসটুকু নিজের হাতে লিখে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। এই সামান্য কয়েকটি শব্দই অনাগত প্রজন্মের কাছে একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে।

সমাধিলেখের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এর শিকড় মিশে আছে প্রাচীন সভ্যতায়। প্রাচীন মিশরীয়রা প্রথম এই প্রথার সূচনা করলেও তাদের ধরণ ছিল কিছুটা ভিন্ন। পরবর্তীতে প্রাচীন গ্রিকরা সমাধিলেখের মধ্যে নিয়ে আসে আবেগের ছোঁয়া এবং কবিতার ছন্দ।

অন্যদিকে রোমানরা তাদের এপিটাফে মৃত ব্যক্তির জীবনের সঠিক তথ্য ও কৃতিত্বের বিবরণ তুলে ধরতে পছন্দ করতেন, যা পরবর্তীকালে ইউরোপীয় দেশগুলোর গির্জার সমাধিফলকে লক্ষ্য করা যায়।

আর্মেনিয়ান চার্চ, আরমানিটোলা, ঢাকা। ছবি- মো. ইমরান 

১৪শ শতাব্দীতে ইংরেজি ভাষায় 'এপিটাফ' শব্দটির প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় এবং ১৬শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমাধি-কবিতা লেখা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সঙ্গীত জগতেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়; যেমন ১৯৫৮ সালে বিখ্যাত সুরকার ইগর স্ট্রাভিনস্কি বাঁশি ও হার্পের সুরের মূর্ছনায় রচনা করেছিলেন ‘এপিটাফিয়াম’।

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসেও এপিটাফের এক অনন্য নজির রয়েছে। ১৯৯৯ সালে বিজ্ঞানী ইউজিন শুমেকারের চিতাভস্ম ও এপিটাফ একটি মহাকাশযানে করে চাঁদে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে তিনি হয়ে যান চাঁদে সমাহিত হওয়া বিশ্বের একমাত্র মানুষ।

একটি এপিটাফ হতে পারে প্রচণ্ড আবেগঘন কিংবা অদ্ভুত রকমের হাস্যরসাত্মক। হাস্যরসের রাজা স্পাইক মিলিগান যেমন তার সমাধিতে খোদাই করে গেছেন, "আমি তো বলেইছিলাম আমি অসুস্থ!", যা আজও পথচারীদের মুখে হাসি ফোটায়।

আবার বিখ্যাত গণিতবিদ লুডলফ ভ্যান চিউলেন তার অর্জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তার সমাধিতে পাই এর মান খোদাই করে রেখেছিলেন। তাই নিজের এপিটাফটি কেমন হবে, তা অত্যন্ত যত্ন সহকারে ভাবা উচিত। কারণ পাথর যতদিন টিকে থাকবে, এই লেখাটিই হবে আপনার শেষ প্রতিচ্ছবি। আপনি চলে যাওয়ার পর মানুষ আপনাকে কীভাবে মনে রাখুক তা আজই কয়েকটা শব্দের বুননে সাজিয়ে রাখার দিন। ঢাকার দুইটি খ্রিস্টান গোরস্তানেও দেখা যায় এপিটাফ। এগুলোর বেশিরভাগে লিখা সমাধিস্থ মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর সন, কোনওটায় মৃত্যুর কারণ আবার কোনওটায় তার পরিচয়।

মৃত্যু আমাদের জীবনের স্বাদকে পূর্ণতা দেয় বলেই হয়তো আমরা জীবনকে এত ভালোবাসি। তাই আজ এই বিশেষ দিনে একবার ভাবুন—যদি আজই শেষ দিন হয়, তবে আপনি পৃথিবীকে কী বলে যেতে চাইবেন?

সর্বশেষ খবর