সুতোমু ইয়ামাগুচি: দুটি পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে ফেরা একমাত্র মানুষ

প্রকাশ :
সংশোধিত :

মানবসৃষ্ট থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোটামুটি সব ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাঁচে মানুষ, লড়াই করে প্রতিদিনের প্রতিকূলতার সঙ্গে। আর মানব ইতিহাসে এমনই একটি বিভীষিকাময় অধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানে ওপর আমেরিকার পারমাণবিক হামলা। এই বোমা কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে, কেড়ে নেয় লাখো প্রাণ। তবে এমনও একজন ছিলেন যিনি এই পারমাণবিক বোমার দুটিই সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। তিনি জাপানি প্রকৌশলী সুতোমু ইয়ামাগুচি। জামান সরকার থেকে স্বীকৃত একমাত্র মানুষ, যিনি শুধু দুটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফিরেছেন তাই নয়, বরং পরে হয়ে উঠেছেন শান্তির এক অদম্য কণ্ঠ।
৬ আগস্ট, হিরোশিমা। সকালটা ছিল একেবারেই সাধারণ। ইয়ামাগুচি তখন ২৯ বছর বয়সী একজন প্রকৌশলী হিসেবে মিতসুবিশি ইন্ডাস্ট্রিজ এর হয়ে হিরোশিমায় একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন।
সে দিন ছিল তার কাজের শেষ দিন। অফিস যাওয়ার পথে, সকাল ঠিক ৮টা ১৫ মিনিটে, আকাশজুড়ে হঠাৎ এক ঝলক বিশাল সাদা আলো ফুটে উঠল। এরপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ।
'লিটল বয়' নামক পারমাণবিক বোমাটি ঠিক তার কাছেই, মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরণে তার কানের পর্দা ছিঁড়ে যায়, তিনি অস্থায়ী ভাবে কিছুক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে যান এবং তার শরীরের অনেকটুকু অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। চারপাশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, তিনি কোনোভাবে একটি আশ্রয় খুঁজে রাত কাটাতে সক্ষম হন।
অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি ৮ আগস্ট নিজের শহর নাগাসাকিতে ফিরে যান। তিনি এতটাই কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন যে, ৯ আগস্ট সকালে অফিসে উপস্থিত হন এবং হিরোশিমার বিভীষিকার বর্ণনা দিতে শুরু করেন সহকর্মীদের কাছে। অথচ কেউ তা বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ঠিক তখনই সকাল ১১টা নাগাদ 'ফ্যাট ম্যান' নামক দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমাটি নাগাসাকিতে বিস্ফোরিত হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, এই বিস্ফোরণেও তিনি প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ছিলেন এবং অফিস বিল্ডিংয়ের ভিতরে থাকায় দ্বিতীয়বারও তিনি মৃত্যুকে ফাঁকি দেন।
নাগাসাকিতে তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় বিস্ফোরণের শকওয়েভের প্রভাবে। তিনি, তার স্ত্রী এবং শিশু সন্তান, সবাই-ই অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং একটি সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিয়ে রাত কাটান।
সেই সময়ের মানুষজন কেউই এমন ঘটনা বিশ্বাস করতে পারেনি, কেউ কেউ তার অভিজ্ঞতাকে গুজব বা মিথ্যা বানানো গল্পও ভেবেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে, দীর্ঘ ৬৪ বছর পরে, জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে 'নিজুয়ু হিবাকুশা' (দুই পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনিই বিশ্বের একমাত্র সরকারিভাবে স্বীকৃত এমন ব্যক্তি।
পরবর্তীতে ইয়ামাগুচি তার বাকি জীবনটি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তির প্রচারে উৎসর্গ করেন। বিভিন্ন বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার ও লেখার মাধ্যমে তিনি মানবতাবিরোধী যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
আশির দশকে, তিনি তার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন,
'ইকাসারেতেইরু ইনোচি' নামে যা ইংরেজিতে অনুবাদ হয় 'আ লাইফ ওয়েল লিভড' অর্থ 'যথার্থ বাঁচা জীবন।' পাশাপাশি তিনি একটি কবিতার বইও লিখেন।
২২শে ডিসেম্বর ২০০৯, কানাডিয়ান চলচ্চিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরন এবং লেখক চার্লস পেলেগ্রিনো নাগাসাকির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন ইয়ামাগুচির সাথে দেখা করেন এবং পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে একটি চলচ্চিত্র তৈরি নিয়ে আলোচনা করেন।
হিরোশিমা বিস্ফোরণের ফলে ইয়ামাগুচির বাম কানের শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। তিনি সাময়িকভাবে তার সব চুল হারান এবং বেশ কয়েক মাস ধরে তাকে ক্রমাগত ব্যান্ডেজ দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয়। ইয়ামাগুচি সুস্থ জীবনযাপন করতে থাকেন। পরবর্তী জীবনে, তিনি চোখে ছানি এবং তীব্র লিউকেমিয়াসহ তেজস্ক্রিয়তাজনিত রোগে ভুগতে শুরু করেন।
নাগাসাকি বিস্ফোরণের পর তার স্ত্রীও তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন এবং ২০০৮ সালে ৮৮ বছর বয়সে কিডনি এবং লিভার ক্যান্সারে মারা যান। তাদের তিন সন্তানেরই স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে যার জন্য নাগাসাকির বিস্ফোরণই দায়ী।
২০০৯ সালে ইয়ামাগুচি জানতে পারেন যে তিনি পাকস্থলীর ক্যান্সারে মারা যাবেন শীঘ্রই। ৪ জানুয়ারী ২০১০ তারিখে ৯৩ বছর বয়সে নাগাসাকিতে মারা যান এই কিংবদন্তী।
তার জীবনের গল্প শুধু একটি দুর্লভ ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং একটি নিষ্ঠুর সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি দেশের হাজারো মানুষের যন্ত্রণার নীরব চিৎকারের প্রতিচ্ছবি এবং একটি ব্যক্তির পক্ষ থেকে শান্তির জন্য নিরন্তর আহ্বান।
samiulhaquesami366@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.