শৈশবের গরম বনাম বর্তমানের গরম

ছবি: এআই জেনারেটেড কোলাজ  
ছবি: এআই জেনারেটেড কোলাজ  

প্রকাশ :

সংশোধিত :

একসময় গ্রীষ্ম মানেই ছিল আনন্দ। এখন গ্রীষ্ম মানেই আতঙ্ক।

জুন মাসের দুপুর। বাইরে রোদ টনটন করছে। থার্মোমিটারের পারদ ৩৮ ছুঁই ছুঁই। আবহাওয়া অধিদপ্তর তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে। স্কুল বন্ধ, মাঠ ফাঁকা। রাস্তায় মানুষ নেই বললেই চলে। কিন্তু মাত্র বিশ-পঁচিশ বছর আগে এই একই দুপুরে কী হতো?

পাড়ার মাঠে ক্রিকেট খেলা চলত। পুকুরঘাটে ছেলেমেয়ের দল ঝাঁপ দিত। আমগাছের নিচে দাদা-নানার কাছে গল্প শোনা হতো। আর মা ডাকতেন,  'বাসায় আয়, ভাত খা।' গ্রীষ্ম বদলে গেছে। আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে আমাদের গ্রীষ্মের সঙ্গে সম্পর্কটাও।

আমের গন্ধ আর পুকুরের ডাক

আগের প্রজন্মের কাছে গ্রীষ্ম মানে ছিল একটা উৎসব। স্কুল ছুটি পড়লেই শুরু হতো দিন গোনা। কে কার বাড়ি বেড়াতে যাবে, কোন নদীতে সাঁতার কাটবে, কোন বাগানের আম সবার আগে পাকবে, এই নিয়েই চলত হিসাব।

গরামের সকালে উঠে প্রথম কাজ ছিল আমতলায় যাওয়া। রাতে বাতাসে কোনো আম পড়েছে কিনা দেখা। কাঁচা হলেও সমস্যা নেই, লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া যাবে। পাকা হলে তো কথাই নেই।

দুপুরটা কাটত পুকুরে। সাঁতার না জানলেও ঠেলাঠেলি, ডুবোডুবি আর জলের মধ্যে দৌড়াদৌড়িতে ঘণ্টা পার হয়ে যেত। মা বকতেন, তবু পরের দিনও একই কাণ্ড।

বিকেলে খেজুরগাছের ছায়ায় বা বটতলায় জমত আড্ডা। বড়রা গল্প করতেন, ছোটরা শুনত। কেউ কেউ দাবা খেলত, কেউ লুডু। হাতপাখা দুলত ধীরে ধীরে। ঘুমের মধ্যে হারিয়ে যাওয়াটাও ছিল একটা আনন্দ। রাতে উঠানে মাদুর বিছিয়ে শোওয়া ছিল তখনকার সংস্কৃতি। আকাশভরা তারা দেখতে দেখতে ঘুম। গায়ে বাতাস লাগলে কত আরাম। এই ছিল গরমের শৈশব।

গরম এখন ভিন্ন

এখন সেই আনন্দ আর নেই। গরম এখন একটা বিপদ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা উঠেছিল ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও উপরে  যা গত ৫০ বছরের রেকর্ড। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, হিটস্ট্রোকে প্রতি বছর মারা যাচ্ছেন বহু মানুষ। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

এই পরিস্থিতিতে শিশুকে বাইরে খেলতে পাঠানো মানে ঝুঁকি নেওয়া। তাই মাঠ খালি, পুকুরঘাট নিরিবিলি।

এখনকার শিশুর গ্রীষ্ম কাটে ঘরের ভেতরে। মোবাইল স্ক্রিনে। কার্টুন দেখে, গেম খেলে। এসি চললে ভালো, না চললে ফ্যানের নিচে গড়াগড়ি।

আমের গন্ধ এখনও আছে, তবে তা আসে দোকানের প্যাকেট থেকে। পুকুর এখন অনেক পাড়া থেকেই উঠে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলো নোংরা অথবা বিপজ্জনক বলে মায়েরা যেতে দেন না।

শুধু বাড়েনি, পাল্টে গেছে গরম

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা গত ৫০ বছরে প্রায় ১ থেকে দেড় ডিগ্রি বেড়েছে। শুনতে সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব বিশাল।

গরমের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে। মার্চেই এখন গরম পড়তে শুরু করে, চলে জুন পর্যন্ত। আগে যেটুকু স্বস্তি ছিল সেটাও কমে আসছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শহরের নিজস্ব সমস্যা। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরে এখন গাছপালা কম, পিচের রাস্তা বেশি, ভবন বেশি। এই পরিবেশ তাপ ধরে রাখে। ফলে শহরের তাপমাত্রা গ্রামের চেয়ে ৩-৫ ডিগ্রি বেশি হয়ে যায়।

লোডশেডিং আরেকটি নতুন যন্ত্রণা। বিদ্যুৎ গেলে ফ্যান বন্ধ, এসি বন্ধ। গরমের মধ্যে অন্ধকারে বসে থাকার সেই অভিজ্ঞতা এখনকার প্রজন্মের জানা।

যা হারিয়ে গেছে, যা তৈরি হয়েছে

গরমের সঙ্গে পাল্টে গেছে জীবনযাপনও। হাতপাখা এখন স্মৃতি। মাটির কলসির ঠান্ডা পানি এখন ফ্রিজের বোতল। উঠানে ঘুমানো এখন গল্পের বিষয়। ছাদে শোওয়া প্রায় বন্ধ, কারণ রাতের তাপমাত্রাও এখন অনেক বেশি।

গ্রামে গেলে এখনো কিছুটা পুরনো গরম পাওয়া যায়। গাছের ছায়া, মাটির ঘরের শীতলতা, খোলা মাঠে বাতাস, এই অনুভূতি এখনো টিকে আছে কোথাও কোথাও।

কিন্তু শহরের শিশু সেটা চেনে না।তার কাছে গরম মানে স্কুল বন্ধের আনন্দ নয়, তাপপ্রবাহের সতর্কতা। আমের মৌসুম নয়, বরং কতটুকু পানি পান করতে হবে তার নির্দেশনা।

ভবিষ্যতের গরম কেমন হবে?

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা কেবল শুরু। আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের তাপমাত্রা আরও বাড়বে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা আরও ১-২ ডিগ্রি বাড়তে পারে। চরম গরমের দিনের সংখ্যাও বাড়বে।

এর মানে হলো, আজকের শিশু যখন বাবা-মা হবে, তখন গরম আরও কঠিন হবে। তার সন্তান হয়তো আরও বেশি সময় ঘরবন্দি থাকবে।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে- গরমের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা কি পুরোপুরি ভয়ের হয়ে যাবে? আনন্দের কোনো সুযোগ কি থাকবে না? গরমকে ভালোবাসতে পারব কি আবার? হয়তো পারব, যদি আমরা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিই।

গাছ লাগানো, পুকুর বাঁচানো, খোলা মাঠ রক্ষা করার মতো ছোট ছোট কাজ মিলিয়ে একটা পরিবর্তন আনা সম্ভব। শহরে ছায়াময় রাস্তা তৈরি করা যায়। স্কুলের মাঠে গাছ রোপণ করা যায়।

তাহলে হয়তো একদিন আবার গরম মানে হবে আম-লিচুর গন্ধ, পুকুরের ছলাৎছলাৎ, দুপুরের আলসে ঘুম।

শৈশবকালের গরমের দিনগুলো ফিরিয়ে আনা কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়,যদি এখনই শুরু করা যায়।

mahmudnewaz939@gmail.com

সর্বশেষ খবর