সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন?

প্রকাশ :
সংশোধিত :

প্রাচীনকালে পৃথিবী কোনও নিয়মের বেড়াজালে আটকে না থাকলেও সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে গড়ে উঠেছে হাজারো রীতি-নীতি। আর এরই সুবাদে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নগর কিংবা রাষ্ট্র।
তবে মজার বিষয় হলো, একই আকাশের নিচে বাস করা এই মানুষগুলো দূরত্বের উপর ভিত্তি করে পার্থক্য গড়ে তুলেছে নিজেদের স্বভাব কিংবা সংস্কৃতিতে। তার উপর অত্যধিক নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে মানুষের জীবনযাপনেও এসেছে যথেষ্ট পরিবর্তন।
যেমন ধরুন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে যা স্বাভাবিক, আফগানিস্তানের কাবুলে হয়তো সেটি চিন্তাও করতে পারবেন না। একইভাবে লাস ভেগাস কিংবা শিকাগোর মানুষের জীবনযাত্রার সাথে মধ্য প্রাচ্যের কোনও শহরের তুলনা হয়তো যুৎসই হবে না।
এর পেছনে একদিকে যেমন রয়েছে মানুষের আয় ও ব্যয়ের ভিন্নতা, ঠিক তেমনি রয়েছে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব। চলুন জেনে নেয়া যাক পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল শহরগুলোতে মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে।
নিউ ইয়র্ক
নিউ ইয়র্ক সম্পর্কে একটি পরিচিত বাক্য হলো- 'দ্য সিটি নেভার স্লিপস'. অর্থাৎ এই শহর কখনও ঘুমায় না। বাস্তবেও ঠিক তাই। গভীর রাতেও এই শহরে মানুষের বেশ আনাগোনা দেখা যায়।
তবে নিউ ইয়র্কের জীবনযাত্রা শুধু বৈচিত্র্যময়ই নয়, বরং বেশ ব্যয়বহুলও। আর তাই তো সংসার খরচ চালাতে মূল কাজের পাশাপাশি পার্ট টাইম চাকরি এখানে বেশ পরিচিত।
তবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বেশ কিছু বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তর নিউ ইয়র্কে হওয়ার কারণে এখানে বেশ ভালো বেতনে চাকরি পাওয়া সম্ভব যদিও তা খুবই প্রতিযোগিতাপূর্ণ।
এছাড়া ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপ থাকাতে সেগুলোও এখানকার কর্মসংস্থানের বড় উৎস।
শিক্ষা, খাবার, ফ্যাশন কিংবা বিনোদন জগত- সব ক্ষেত্রেই নিউ ইয়র্ক বেশ এগিয়ে। বিভিন্ন জরিপ অনুসারে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বিলিয়নিয়ারের বাসও এই শহরেই।
লন্ডন
লন্ডনকে সমগ্র ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র বললেও হয়তো ভুল হবে না। ঔপনিবেশিক যুগে এই শহর থেকেই পৃথিবীর বেশিরভাগ অংশ শাসন করা হতো। আর তাদের রাজকীয় জীবনধারার এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বাকিংহাম প্যালেসের রাজপ্রাসাদটি এখনও টিকে আছে যদিও রাজপরিবারের ক্ষমতা এখন অনেকটাই সীমিত।
জীবনযাত্রার দিক থেকে লন্ডন যেমন উন্নত, ঠিক তেমনি ব্যয়বহুল। ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই শহর থেকে পরিচালিত হয়। এছাড়া তথ্য-প্রযুক্তির সুবাদে এখানে বেশ কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যেখানে মোটা অংকের বেতনে কাজ করছে দেশী-বিদেশী অনেকেই।
এছাড়া এই শহরকে থিয়েটার, আর্ট, মিউজিয়াম কিংবা লাইভ মিউজিকের শহর বললেও ভুল হবে না।
তাই তো এখানে বসবাসকারী মানুষ কখনোই বিনোদনের অভাব বোধ করে না। এছাড়া রাস্তার পাশে বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে গান গেয়ে পথচারীদের বিনোদন দেয়াটাও এই শহরের এক চিরায়ত রূপ।
যেহেতু অর্থ কিংবা বিনোদনে এই শহর বেশ এগিয়ে, তাই এখানকার জীবনযাত্রার ব্যয়ও অত্যধিক। আর তাই তো যারা লন্ডন শহরে নতুন আসেন তাদেরকে প্রাথমিক অবস্থায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বেশ হিমশিম খেতে হয়।
বিশেষ করে যারা স্টুডেন্ট ভিসায় লন্ডন আসেন তাদেরকে এই সমস্যায় বেশি পড়তে হয়। এছাড়া এখানকার আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত ঠিকই, তবে সেটিও অনেক ব্যয়বহুল।
প্যারিস
প্যারিসের নাম শুনলেই অনেকের মাথায় উঠে আসে আইফেল টাওয়ার। তবে শুধু আইফেল টাওয়ারই নয়, এখানকার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোও সবার নজর কাড়ে।
কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এখানকার জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য সবার নেই। কারণ বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে মুদি পণ্য- সব কিছুর দামই এখানে তুলনামূলকভাবে বেশি। এই শহরে প্রচুর চাকরির সুযোগ থাকলেও তার জন্য ফ্রেঞ্চ ভাষা জানা অনেকটাই অবশ্যম্ভাবী।
তবে এখানকার পরিবহন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া শিল্প-সাহিত্যের দিক থেকে ফ্রান্স বরাবরই বেশ প্রসিদ্ধ। এখানকার মানুষ কিছুটা আমুদে স্বভাবের এবং গল্প করতে ভালোবাসে। তাই তো রেস্টুরেন্ট কিংবা ক্যাফেতে বেশ লম্বা সময় ধরে আড্ডায় মেতে ওঠা এই শহরে খুব স্বাভাবিক বিষয়।
হংকং
হংকং চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। প্রশাসনিক দিক থেকে এটি চীনের অন্তর্গত হলেও স্বায়ত্তশাসনের প্রভাবে এখানকার মানুষ তুলনামূলক স্বাধীন এবং এখানে পুঁজিবাদী ভাবধারা লক্ষ্য করা যায়।
তবে চাহিদার তুলনার আবাসন সীমিত হওয়ায় এখানে বাসা ভাড়া অত্যধিক। এছাড়া এই শহরে পুঁজিপতিদের আধিক্য থাকায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত অনেক ব্র্যান্ড তাদের শাখা হংকংয়ে চালু করেছে যা সেখানে একটি আভিজাত্যের আবহ সৃষ্টি করে।
ব্যবসায়, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতেও এই শহর বেশ উন্নত। এখানকার মানুষের মাঝে ইংরেজি ভাষারও প্রচলন রয়েছে যা চীনের অন্যান্য শহরে খুব একটা দেখা যায় না। আর তাই তো এখানে থাকা অভিবাসীদের ভাষাগত সমস্যা অপেক্ষাকৃত কম পোহাতে হয়।
দুবাই
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি প্রদেশের মধ্যে অন্যতম দুবাই। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং 'বুর্জ খলিফা' এই শহরেই অবস্থিত। বিলাসবহুল শপিং কমপ্লেক্স এবং নামি-দামি ব্র্যান্ডের পোশাক কিংবা প্রসাধনী সামগ্রীর জন্য দুবাই বেশ বিখ্যাত।
এখানকার জীবনযাত্রা বেশ ব্যয়বহুল। তাই তো সীমিত আয়ের মানুষজন শহর থেকে কিছুটা দূরে বাসা নিয়ে থাকতে বাধ্য হয়।
তবে সেখানকার মরুভূমিগুলোতেও বিনোদনের জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা রাখা হয় যা পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া দুবাইতে রয়েছে সাত তারকা মানের হোটেল যা সেখানকার বিলাসিতার আরেক নাম। তবে এত কিছু সত্ত্বেও দুবাইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেখানে কোনো ইনকাম ট্যাক্স নেই যা সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিডনি
অস্ট্রেলিয়ার একটি অন্যতম শহরের নাম সিডনি যা সেই দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। সিডনি শহরের স্থাপনাগুলো যেমন সবার নজর কাড়ে, ঠিক তেমনি সেখানকার খাবারও পর্যটকদের কাছে এক অন্যতম আকর্ষণ।
তবে ব্যয়বহুল শহর হিসেবেও সিডনি বিশ্বব্যাপী বেশ জনপ্রিয়। এখানকার আবাসন যেমন ব্যয়বহুল, ঠিক তেমনি যাতায়াতের ক্ষেত্রেও উচ্চ ভাড়া পরিশোধ করতে হয় বাসিন্দাদের।
তবে অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া অনেকটাই পর্যটকবান্ধব। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে তুষারপাতে জনজীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে, সেখানে সিডনিসহ পুরো অস্ট্রেলিয়াজুড়ে বছরের প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই দেখতে পাবেন রৌদ্রৌজ্জ্বল দিন যা পর্যটকদের কাছে বেশ উপভোগ্য।
সিডনি শহরের পাশেই সমুদ্র সৈকত থাকায় অবসরে সেখানে সময় কাটাতে পছন্দ করেন বাসিন্দারা। ভ্যাঙ্কুভার
ভ্যাঙ্কুভার কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের একটি শহরের নাম। ধরা হয়, সমগ্র কানাডার মধ্যে ভ্যঙ্কুভার শহরের জীবনযাত্রা সবচেয়ে ব্যয়বহুল। এখানকার বাসিন্দাদের বাসা ভাড়া বাবদ একটি মোটা অঙ্কের অর্থ প্রতি মাসে খরচ করতে হয় যা অনেকের জন্য বহন করা কষ্টসাধ্য।
এছাড়া যাতায়াত, পার্কিং কিংবা খাবার বাবদ একটি মোটা অর্থ খরচ করতে হয় এখানে। তবে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে এই শহরটি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। এছাড়া স্কিইং, সাইক্লিং এবং হাইকিংয়ের জন্য ভ্যাঙ্কুভার খুব বিখ্যাত।
ভ্যঙ্কুভারে পাওয়া যাবে অসাধারণ কিছু বনভূমি যা অবসর সময়ে মনকে ভালো করে তুলতে পারে। পাশাপাশি অত্যন্ত গোছানো এবং পরিপাটি শহর হিসেবেও ভ্যাঙ্কুভার বেশ পরিচিত। তবে শিক্ষার্থীরা এই শহরে আসার আগে স্কলারশিপ কিংবা পার্ট টাইম চাকরির সুযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আসা উচিত। অন্যথায় জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করা দুর্বিসহ হয়ে উঠতে পারে।

