পুরান ঢাকার ঐতিহ্য নিয়ে মিরপুরেই 'অরজিনাল ঢাকাইয়া খান্দানি কাবাব'

প্রকাশ :

সংশোধিত :

কয়লার আঁচ আর ধোঁয়া, আর সেই সঙ্গে নাকে আসা ঝলসানো মাংসের ঘ্রাণ, খাদ্যরসিকের জিভে জল আনার জন্য হয়তো এটাই যথেষ্ট। পোড়া মাংসের মো মো গন্ধ নাকে এসে ধরা দেয়, তখন আগামীকাল থেকে ডায়েট করতে চাওয়া বন্ধুটিও হয়তো একবার ভেবে বলবে, "সামনের মাস থেকে ডায়েট শুরু করবো।" মিরপুর ৬০ ফিটে অবস্থিত মো. মুসা ভাইয়ের ‘অরজিনাল ঢাকাইয়া খান্দানি কাবাব' নিয়ে অনেকের এমনই মত। কেন এতোটাই জনপ্রিয় মুসা ভাইয়ের ঢাকাইয়া কাবাব আর কতটাই বা খাঁটি বা 'অরিজিনাল' এই খাবার।

মিরপুরের এই অংশে ফাস্টফুডের রাজত্ব থাকলেও, করোনাকালের ঠিক পরে পৃথিবী যখন আবার রসনাবিলাসে মাতলো, তখনই মো মুসা এই খাবারের দোকান শুরু করেন। সবার কাছে 'ভাই' হিসেবে পরিচিত মুসা নিজে পুরান ঢাকার মানুষ। বংশপরম্পরায় তাদের রক্তে মিশে আছে মশলা আর কাবাবের রসায়ন। আত্মীয়স্বজনরা ২০-২৫ বছর ধরে এই ধারায় কাজ করেছেন। সেই পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্র ও নিজের গোপন রেসিপি দিয়েই সাজিয়েছেন এই কাবাবের দোকান।

দোকানের সামনে দাঁড়ালেই দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের কাবাব আর মুরগির টুকরো। মুসা ভাই হাসিমুখে জানান, “সবাই তো একই মশলা ব্যবহার করে, কিন্তু আমাদেরটা একদম ফ্রেশ আর যত্ন দিয়ে বানানো। বাসি কোনও কিছু এখানে পাবেন না।” খাবার সুস্বাদু হলেও এখানে মূল জাদু বিশেষ সসে। এটি তাদের নিজস্ব কায়দায় বানানো।

এই দোকানের নিয়মিত কাস্টমার শেখ আনিকা অনন্যা বললেন, “আমি মিরপুরের অনেক জায়গায় কাবাব খেয়েছি, কিন্তু মুসা ভাইয়ের দোকানের সসের যে ঝাঁঝ আর স্বাদ, সেটা একবার মুখে লাগলে অন্য কোথাও গিয়ে শান্তি পাওয়া যায় না। এই সস দিয়েই মনে হয় খালি লুচি বা নান খেয়ে ফেলা যাবে।”

নকল হতে সাবধান

সফলতার পিছু পিছু আসে নকলের উপদ্রব। মুসা ভাইয়ের দোকানের ঠিক দুই-তিন ঘর পরেই একই নামে আরেকটি দোকান খুলে বসেছে কেউ একজন। অনেকেই ভুল করে সেখানে ঢুকে পড়েন। মুসা ভাই কিছুটা সতর্ক করে দিলেন, “নাম কাছাকাছি দেখে মানুষ ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, আমাদের সাইনবোর্ডে স্পষ্টভাবে লেখা আছে- অরজিনাল ঢাকাইয়া খান্দানি কাবাব। ওটা দেখে না ঢুকলে আসল স্বাদ পাওয়া কঠিন।”

পকেটবান্ধব রাজকীয় আয়োজন

খাবাদের দাম মানানসই। গরম গরম লুচি ১০ টাকা। আর লুচির সাথে চিকেন বারবিকিউ নিলে গুনতে হবে ১৬০ টাকা আর বিফ বটির স্বাদ পেতে হলে লাগবে ১৭০ টাকা।

এছাড়া বিফ চাপ ১৭০ টাকা ও মগজ ফ্রাই পাওয়া যায় ২২০ টাকায়। আরও আছে চিকেন চাপ ১২০ টাকা, উইংস ১৪০, চিকেন শিক ১০০ ও বিফ শিক ১৬০ টাকা।

প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি মুরগি এখানে কয়লায় পোড়ানো হয়। অথচ মুসা ভাইয়ের কোনও অনলাইন ডেলিভারি বা হোম সার্ভিস নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তেমন সরব নন তিনি। আবার কোনও বাড়ি বা অনুষ্ঠানের অর্ডারও নেন না। "এখানে মানুষকে সামলাতেই হিমশিম খাই, অনলাইনে অর্ডার নেওয়ার সময় কোথায়?” বলেন ব্যস্ত মুসা ভাই। এই দোকানে নতুন কাস্টমার কম, পুরোনো কাস্টমারই বেশি। অফার ও ডিস্কাউন্টের মতো কর্পোরেট শব্দের জায়গা নেই এখানে।

আগে বসার জায়গা কম থাকলেও এখন দোকান বড় করা হয়েছে। আটজন কর্মচারী, তার মধ্যে মুসা ভাইয়েরা তিন ভাই নিজেরাই মাঠে নেমে কাজ করেন। প্রায় ২০ জন মানুষ একসাথে বসে আয়েশ করে খেতে পারেন। দোকানের বাইরে বসেও খায় অনেকে। বিকেল ৫টা বাজার আগেই চুলা জ্বলে ওঠে। বিকেল ৪টা থেকে বারবিকিউ, ৫টা থেকে সব খাবার পাওয়া যায়। রাত ১১টা পর্যন্ত চলে ভোজনরসিকদের আনাগোনা।

ahoona2000@gmail.com

সর্বশেষ খবর