প্রচণ্ড গরম ও মাইগ্রেনের সমস্যা? সমাধান জেনে নিন

প্রকাশ :
সংশোধিত :

প্রচণ্ড গরমে মাথাব্যথা দৈনন্দিন জীবনে অনেকেই এই যন্ত্রণাকে স্বাভাবিক মনে করেই এড়িয়ে যান। কিন্তু যখন ব্যথা প্রচন্ড বেড়ে যায়, আলো বা শব্দের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে সাথে শুরু হয় বমিভাব তখন সেটি আর সাধারণ মাথাব্যথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বলা হয় মাইগ্রেন।
মাইগ্রেন এমনই এক তীব্র মাথাব্যথা। এটি তুলনামূলক বেশি কষ্টদায়ক, দীর্ঘমেয়াদী ও বারবার হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মাইগ্রেন হলো বিশ্বের অন্যতম প্রধান ১০ টি রোগের মধ্যে একটি যার কারনে প্রতিবন্ধিতা হতে পারে। আমাদের দেশেও এর প্রভাব কম নয়। সচেতনতা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নিয়মিত যত্ন নিলে মাইগ্রেনকে অনেকাংশেই নিরাময় করা সম্ভব।

কেন হয় মাইগ্রেন?
মাইগ্রেন আসলে কেন হয় সেটি স্পষ্টভাবে জানা যায় না। তবে কিছু কারণ রয়েছে যেগুলো মাইগ্রেনের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে মানসিক চাপ, ঘুমের সমস্যা ও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা বেশি খাওয়া অন্যতম। এছাড়া, হরমোনের পরিবর্তন (বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে ) স্ক্রিন টাইম বেশি, উজ্জ্বল আলো বা জোরে শব্দের কারণেও মাইগ্রেন হতে পারে। আবার পরিবেশ পরিবর্তন (অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম) ও বংশক্রম বা জেনেটিকসহ আরও নানান কারণ এর মাইগ্রেনের জন্য দায়ী হতে পারে। তবে ব্যক্তি ভেদেও এর কারণ পরিবর্তন হতে পারে।
মাইগ্রেন একটি জটিল স্নায়বিক সমস্যা। এতে শুধু মাথাব্যথা নয়, বমি ভাব, আলো-শব্দে অস্বস্তি ও মাথার একপাশেব্যথা হয়।
অন্যান্য মাথাব্যথা থেকে অনেকাংশ দীর্ঘস্থায়ী, সাধারণত চার ঘণ্টা থেকে বাহাত্তর ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
মাইগ্রেন বিশ্রাম নিলে কিছুটা কমে এলেও পরিশ্রম করলে আবার বেড়ে যায়।
মাইগ্রেন কি আকস্মিক হয়?
মাইগ্রেন কিন্তু আকস্মিক হয় না। মাইগ্রেনের বেশ কিছু ধাপ রয়েছে; সাধারণত চারটি। এরমধ্যে প্রথম ধাপ টি হচ্ছে 'প্রোডম।'
এই ধাপে মাথাব্যথা শুরু হবার পূর্বে কিছু লক্ষণ দেখা দেয় যেমন: মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, শরীরে শক্তি না পাওয়া, আচরণগত এবং ক্ষুধা নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
দ্বিতীয় ধাপটি হলো 'অরা।' এই ধাপে চোখে আলোর ঝলকানি দেখা বা একেবারেই চোখে না দেখা এরকম কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
এই লক্ষণগুলো পাঁচ মিনিট থেকে এক ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
তৃতীয় ধাপ হচ্ছে 'মাথাব্যাথা পর্যায়।'
এই পর্যায়ে তীব্রতার মাথাব্যথার পাশাপাশি আরও যেমন: অসুস্থতা বোধ করা, বমি বমি ভাব হওয়া, শব্দ ও আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়া। এই ধরনের লক্ষণ ৪ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
চতুর্থ পর্যায়টি হচ্ছে 'রেজুলেশন ধাপ' বা একে 'পোস্ট ড্রোম'ও বলা যায়। এই ধাপে এসে মাথাব্যথা ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
তবে শরীরে যে দুর্বলভাব তৈরি হয়, এই ভাবটা বেশ কয়েকদিন ধরেই চলতে থাকে।
একটি জরিপ মতে, প্রতি পাঁচ জন নারীর মধ্যে একজন এবং প্রতি পনেরো জন পুরুষের মধ্যে একজন মাইগ্রেনে ভুগে থাকেন। এটি ছোট থেকে বড় সকলের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
হঠাৎ তীব্র ব্যথার কারণে পড়াশোনা, কাজকর্ম ও স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের অফিসের কাজ ও পেশাগত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তাহলে উপায় কি?
দৈনন্দিন জীবনে মাইগ্রেনের নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায়, এ থেকে বাঁচার উপায় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে গ্রীন লাইফ হাসপাতালের ডাক্তার মারিয়া ইসলাম ববি জানান মাইগ্রেন থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা জরুরী। জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনতে পারলে মাইগ্রেনের ঝুঁকি কমানো যায়। এ বিষয়ে তিনি বলেন, "যখন ব্যথা শুরু হবে, তখন যত দ্রুত সম্ভব বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। বিশ্রাম অনেকাংশে স্বস্তি এনে দিতে পারে।"
তবে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্রামে ব্যথা কিছুটা কমলেও কিছুক্ষণ পর আবার সেটি তীব্রভাবে ফিরে আসে। তখন করণীয় কী এই প্রসঙ্গে তিনি জানান "বিশ্রামে ব্যথা না কমলে ওষুধের ব্যবহার করতে হবে। তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শে ব্যথা কমানোর ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া ঠিক নয় এতে করে সমস্যা বাড়তে পারে।"
আমরা অনেকেই নিজে থেকেই না জেনে বিভিন্ন ওষুধ সেবন করতে থাকি যা হয়তো সাথে সাথে কোন ও প্রতিক্রিয়া দেখায় না তবে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে ফেলে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহারই ভালো।

জীবনযাপনে কেমন পরিবর্তন প্রয়োজন?
এছাড়াও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম যেগুলো সাধারণ জীবনযাত্রায় মেনে চললে মাইগ্রেন অনেকাংশে নিরাময় সেগুলো মেনে চলা প্রয়োজন।

কোন কোন বিষয় মেনে চললে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে সে বিষয়ে ডাক্তার মারিয়া ইসলাম ববি বলেন, "মাইগ্রেনের একটি বড় অংশ জীবনযাত্রার মানের উপর নির্ভর করে, তাই ঠিকমতো ঘুমানো, সময়মতো খাবার, প্রচুর পানি পান করা, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কমালে অনেকাংশে উপকারিতা পাওয়া যাবে।"
দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যেমন অনেক কিছু মেনে চলতে হবে তেমনি কিছু জিনিস এড়িয়ে চলতে পারলেও মাইগ্রেনের এই তীব্র মাথাব্যথা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে তিনি বলেন, "বেশি রোদ বা আলো, প্রচন্ড শব্দ, নির্দিষ্ট খাবার যেমন: অতিরিক্ত চা কফি এবং ফাস্টফুড এড়িয়ে চললেও মাইগ্রেন থেকে অনেকটা দূরে থাকা যায়।"
তবে অনেকের এমনও হয় যে সবকিছু মেনে চলছে অথচ মাইগ্রেন কমছেই না। এক মাসে যদি কেউ পাঁচ বারের বেশি মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন তাহলে তাকে চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে। এছাড়াও কিছু গুরুতর উপসর্গ রয়েছে, যেগুলো দেখা দিলে অবশ্যই সাথে সাথে দেরি না করে হাসপাতালে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো, মুখ বা হাতে কোনও অংশ যদি প্যারালাইসিস হয় বা যদি দুর্বলতা অনুভব হয়, কথা বলার সময় কথা যদি অস্পষ্ট হয়, মাথাব্যথা সাথে যদি তীব্র জ্বর থাকে, ঘাড় শক্ত হয়ে যায়, শরীরে র্যাশ দেখা যায়; এসব উপসর্গ দেখা দিলে তাহলে অবশ্যই দেরি না করে তাকে হাসপাতাল নিতে হবে।
কোন বিভাগের ডাক্তারে কাছে যাওয়া উচিত?
মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে কোনও বিভাগে বা কোন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত এবিষয়ে ডা: মারিয়া ইসলাম ববি পরামর্শ দেন, " মাইগ্রেন অনেক দীর্ঘ মেয়াদী বা অনেক তীব্র হলে তখন প্রাথমিকভাবে কোন মেডিসিন বিভাগের ডাক্তার দেখাতে হবে। তার নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে।"
মাইগ্রেন একটি জটিল হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা। সচেতনতা, নিয়ন্ত্রিত অভ্যাস এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে এর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব।
mariumsara001@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.