ওজন কমাতে আপেল সাইডার ভিনেগার: যে ভুলগুলো করবেন না

প্রকাশ :

সংশোধিত :

আপেল সাইডার ভিনেগার বহুদিন ধরে জনপ্রিয় একটি ঘরোয়া উপাদান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ এটি রান্না এবং প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ব্যবহার করে আসছে। আধুনিক গবেষণাও বলছে এটির কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা থাকতে পারে, যদিও এই বিষয়ে গবেষণা এখনও সীমিত। তাই এটিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার আগে আরও বিস্তৃত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রয়োজন। চলুন, বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে আপেল সাইডার ভিনেগারের ৫টি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ দেখে নেয়া যাক।

অ্যাসিটিক অ্যাসিডে সমৃদ্ধ

ভিনেগারের প্রধান সক্রিয় উপাদান হলো অ্যাসিটিক অ্যাসিড। এর ঝাঁঝালো স্বাদ ও গন্ধের পেছনেও এই উপাদান দায়ী। গবেষকদের ধারণা, আপেল সাইডার ভিনেগারের বেশিরভাগ সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতার পেছনে এই অ্যাসিটিক অ্যাসিডের ভূমিকা রয়েছে।

সাধারণভাবে আপেল সাইডার ভিনেগারে প্রায় ৫ শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিড থাকে। অর্গানিক ও আনফিল্টারড ভিনেগারে অনেক সময় ‘মাদার’ নামের একটি ঘোলা উপাদান দেখা যায়, যা প্রোটিন, এনজাইম ও কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সমন্বয়ে গঠিত।

ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে সহায়ক

ভিনেগার বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু ধ্বংস করতে পারে, যার মধ্যে কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও রয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, মানুষ ঘর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখতে, নখের ফাঙ্গাস, উকুন, আঁচিল এবং কানের সংক্রমণের মতো সমস্যা দূর করতে ভিনেগার ব্যবহার করেছে। এমনকি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিসও প্রায় দুই হাজার বছর আগে ক্ষত পরিষ্কার করতে ভিনেগার ব্যবহার করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

রক্তে শর্করা কমাতে ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

ভিনেগারের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণভিত্তিক সম্ভাব্য ব্যবহারগুলোর একটি হলো টাইপ টু ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা। টাইপ টু ডায়াবেটিসে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন উৎপাদনের ঘাটতির কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, আপেল সাইডার ভিনেগার রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

ডায়াবেটিস নেই এমন ব্যক্তির রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখলে উপকৃত হতে পারেন। কারণ দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে বার্ধক্য ও নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এনসিসিআইএইচ জানিয়েছে, এটি চিকিৎসার বিকল্প নয় এবং প্রমাণহীন পণ্য দিয়ে কখনোই চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়। বিশেষ করে যারা রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধ খান, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।

ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে 

আপেল সাইডার ভিনেগার তৃপ্তির অনুভূতি বাড়াতে পারে, ফলে কম ক্যালরি গ্রহণ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এনসিসিআইএইচ এর গবেষণায় দেখা যায়, খাবারের সঙ্গে ভিনেগার গ্রহণ করলে প্রায় ১২০ মিনিট পর্যন্ত ক্ষুধা কম থাকে এবং ৩ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নাস্তার প্রবণতা কমে যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় এই প্রভাব সবসময় একই রকম দেখা যায়নি।

হৃদস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য উপকারিতা

হৃদ্‌রোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এক্ষেত্রে, এনসিসিআইএইচ এর গবেষকরা দেখেছেন, আপেল সাইডার ভিনেগার এইচডিএল (ভালো কোলেস্টেরল), এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল), ট্রাইগ্লিসারাইড ও মোট কোলেস্টেরলের মাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এ ধরনের গবেষণার অনেকটাই প্রাণীর ওপর করা হয়েছে এবং মানবভিত্তিক গবেষণার পরিসর এখনও সীমিত। তাই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

পুষ্টিবিদের পরামর্শ

ল্যাবএইড আইকনিকের সিনিয়র পুষ্টিবিদ ফাহমিদা হাশেম জানান, একজন ব্যক্তি কোন উদ্দেশ্যে আপেল সাইডার ভিনেগার খাচ্ছেন তার ওপর ব্যবহার নির্ভর করে। ওজন কমাতে চাইলে সকালে কুসুম গরম পানিতে ইসবগুল বা চিয়াসিডের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, অনেকেই ভিনেগারের সঙ্গে লেবু যোগ করেন যা উচিত নয়, কারণ লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড এবং ভিনেগারে অ্যাসিটিক অ্যাসিড থাকে; একসঙ্গে দুই ধরনের অ্যাসিড গ্রহণ ঠিক নয়।

ডায়াবেটিস রোগীরা (ওষুধ গ্রহণকারী) সুগার নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলে খাওয়ার আগে বা খাওয়ার ৩০ মিনিট পরে নিতে পারেন তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়।

সর্বোচ্চ ২ টেবিল চামচ পর্যন্ত নেওয়া গেলেও সাধারণভাবে ১ টেবিল চামচই যথেষ্ট। অন্তত ২০০ মিলিলিটার পানিতে ১ টেবিল চামচ আপেল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে খাওয়া উচিত। পানি ছাড়া কোনোভাবেই নয়।

তিনি সতর্ক করে বলেন গলা দিয়ে টক পানি আসা/গলা জ্বলা, হাইপোক্যালেমিয়া, ইনসুলিন গ্রহণকারী ডায়াবেটিস রোগী, কিডনিতে অ্যাসিটিক পাথর, অ্যালার্জি সমস্যা, দাঁতের এনামেল ক্ষয়, অস্টিওপোরেসিস—এ ধরনের ক্ষেত্রে এটি এড়িয়ে চলা উচিত। একান্তই খেতে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

mahmudnewaz939@gmail.com

সর্বশেষ খবর