নম্বরের বাইরে শিশুর শেখার আনন্দ নিশ্চিত করবেন যেভাবে

প্রকাশ :
সংশোধিত :

শিশুরা জন্মগতভাবে কৌতূহলী। নতুন কিছু দেখা, প্রশ্ন করা, কিছু ভেঙে আবার গড়া—এসবের মধ্য দিয়েই তারা পৃথিবীকে চিনতে শেখে। কিন্তু বড় হতে হতে অনেক শিশুর মধ্যেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে দেখা যায়। বই তখন আনন্দের জায়গা না হয়ে চাপের জায়গা হয়ে ওঠে। অনেক সময় এর পেছনে শুধু স্কুল বা পরীক্ষার চাপ নয়, শিশুর নিজের সম্পর্কে গড়ে ওঠা ধারণাটাও বড় ভূমিকা রাখে।
মনোবিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—'অ্যাকাডেমিক সেলফ-কনসেপ্ট' বা শিক্ষাগত স্ব-মর্যাদা। সহজভাবে বললে, একজন শিশু নিজেকে কেমন শিক্ষার্থী মনে করে, সেটাই তার শিক্ষাগত স্ব-মর্যাদা। সে কি মনে করে, ‘আমি ভালো ছাত্র'? নাকি ভাবে, ‘আমি পড়াশোনায় তেমন ভালো নই'? এই ধারণাগুলো খুব নীরবে, খুব অল্প বয়স থেকেই তৈরি হতে শুরু করে।
একজন মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণার অনেকগুলো দিক থাকে। কেউ নিজেকে খুব সৃজনশীল ভাবতে পারে, কেউ ভাবতে পারে সে খেলাধুলায় ভালো, কেউ আবার সামাজিকভাবে আত্মবিশ্বাসী। একইভাবে একজন শিশু নিজের পড়াশোনা সম্পর্কেও একটি পরিচয় গড়ে তোলে। কেউ ভাবে, ‘আমি গণিতে দুর্বল', কেউ ভাবে, ‘আমাকে শিক্ষকরা পছন্দ করেন না', আবার কেউ মনে করে, ‘আমি ক্লাসের স্মার্ট ছাত্রদের একজন।’
সমস্যা হলো, এই ধারণাগুলো একবার গভীরে বসে গেলে পরে বদলানো কঠিন হয়ে যায়।
আমরা বড়রাও হয়তো নিজেদের স্কুলজীবনের কথা ভাবলে দ্রুত কিছু পরিচয় মনে করতে পারি। অনেকেই বলেন—'আমি কখনো গণিতে ভালো ছিলাম না', ‘স্কুল আমার জন্য সহজ ছিল' কিংবা ‘আমি ভালো শিক্ষার্থী ছিলাম না। অর্থাৎ, শৈশবে নিজের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, সেটাই অনেক বছর ধরে থেকে যায়।
শিশুরাও খুব দ্রুত নিজেদের অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে শেখে। ক্লাসে কেউ যদি দ্রুত অঙ্ক করতে পারে, কেউ যদি পরীক্ষায় সবসময় বেশি নম্বর পায়, তাহলে অন্য শিশুরা নিজেদের নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করতে পারে। কোনো শিশু হয়তো অঙ্কের ওয়ার্কশিট শেষ করতে একটু বেশি সময় নেয়। তখন সে মনে করতে শুরু করে, ‘আমি বোধহয় স্মার্ট না’ কিংবা ‘আমি গণিতে খারাপ।’
কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি অঙ্ক কত দ্রুত করা যায়, সেটি কখনোই একটি শিশুর বুদ্ধিমত্তার পুরো পরিচয় হতে পারে না। তবুও শিশুরা প্রায়ই এই ভুল বার্তাটাই মনে গেঁথে ফেলে।
এখানেই অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক অভিভাবক অনিচ্ছাকৃতভাবেই শুধু নম্বর বা গ্রেডকে গুরুত্ব দেন। পরীক্ষায় কম নম্বর এলেই হতাশা, তুলনা বা বকা শুরু হয়। কিন্তু শুধু ফলাফলের দিকে তাকালে শিশুর পরিশ্রম, ধৈর্য, সৃজনশীলতা কিংবা শেখার আগ্রহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যায়।
একটি শিশু হয়তো ক্লাসে প্রথম হয়নি, কিন্তু সে প্রতিদিন নিয়ম করে পড়তে বসছে। হয়তো সে ধীরে শেখে, কিন্তু খুব মনোযোগ দিয়ে শেখে। আবার কেউ হয়তো অসাধারণ কল্পনাশক্তি দিয়ে গল্প লিখতে পারে। এগুলোও অর্জন। বরং জীবনের বড় সাফল্য অনেক সময় এই গুণগুলোর ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।
তাই শিশুদের ইতিবাচক শিক্ষাগত স্ব-মর্যাদা গড়ে তুলতে হলে শুধু গ্রেড নয়, তাদের সামগ্রিক প্রচেষ্টা ও আচরণের দিকেও নজর দিতে হবে।
অভিভাবকরা ছোট ছোট কথার মাধ্যমেও শিশুর মনে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। যেমন—
'ওয়াও, তুমি তোমার অ্যাসাইনমেন্টে সত্যিই অনেক পরিশ্রম করেছ, এটা দেখে আমি মুগ্ধ।’
অথবা—' কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয়নি, তুমি নিজে থেকেই পড়তে বসেছ। এটা অনেক মনোযোগের পরিচয়।’
আবার বলা যেতে পারে—'তোমার চিন্তাগুলো খুব সুন্দর। তুমি অন্যভাবে ভাবতে পারো, এটা দারুণ একটা গুণ।’
এই ধরনের মন্তব্য শিশুদের শুধু যে ভালো লাগে তাই না, তারা নিজেদের ভেতরের গুণগুলো চিনতেও শেখে। তখন তারা বুঝতে শুরু করে যে একজন ভালো শিক্ষার্থী হওয়া মানে শুধু দ্রুত উত্তর দেওয়া বা বেশি নম্বর পাওয়া নয়। ধৈর্য, কৌতূহল, চেষ্টা, আত্ম-শৃঙ্খলা—এসবও একজন শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়।
অনেক সময় দেখা যায়, যে শিশু স্কুলে গড়পড়তা ফল করে, সেই বড় হয়ে অসাধারণ কোনো কাজ করছে। কারণ সে হাল ছাড়েনি, নিজের আগ্রহ ধরে রেখেছে। আবার কেউ হয়তো ছোটবেলায় সব বিষয়ে ভালো ছিল, কিন্তু ব্যর্থতার ভয় তাকে পরে পিছিয়ে দিয়েছে। তাই শিশুদের শেখাতে হবে—ভুল করা মানেই ব্যর্থ হওয়া নয়। বরং ভুল থেকেই শেখার সুযোগ তৈরি হয়।
শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে পরিবারের পরিবেশ থেকে। যদি ঘরে সবসময় শুধু নম্বর, রেজাল্ট আর তুলনার কথা হয়, তাহলে পড়াশোনা তাদের কাছে ভয় বা চাপের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি পরিবারে শেখাকে আনন্দের বিষয় হিসেবে দেখা হয়—নতুন কিছু জানার আনন্দ, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, বই পড়ার অভ্যাস—তাহলে শিশুর মনেও শেখার প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হয়।
এ কারণে অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সঙ্গে শুধু ‘কত নম্বর পেয়েছ?’ ধরনের কথা না বলে, ‘আজ নতুন কী শিখলে?’ কিংবা ‘কোন বিষয়টা তোমার সবচেয়ে মজার লেগেছে?’—এ ধরনের আলাপ করা।
একজন শিশু যখন অনুভব করে যে তার চেষ্টা, কৌতূহল আর ব্যক্তিত্বকে মূল্য দেওয়া হচ্ছে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আর আত্মবিশ্বাস বাড়লে শেখার আগ্রহও বাড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি শিশুই আলাদা। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে। কেউ অঙ্কে ভালো, কেউ গল্পে। কেউ চুপচাপ, কেউ প্রশ্ন করতে ভালোবাসে। তাই অন্য কারও সঙ্গে তুলনা না করে শিশুকে তার নিজের গতিতে বেড়ে উঠতে সাহায্য করাই সবচেয়ে জরুরি।
কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা শুধু ভালো গ্রেড পাওয়ার বিষয় নয়। শিক্ষা হলো নিজেকে আবিষ্কার করা, চিন্তা করতে শেখা এবং নিজের সম্ভাবনাকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা।
(অ্যালিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত ক্যালিফোর্নিয়া স্কুল অব প্রফেশনাল সাইকোলজির অধ্যাপক ও প্রখ্যাত চাইল্ড সাইকোলজিস্ট ড. রোনাল্ড স্টলবার্গের লেখা অবলম্বনে)
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.