মুঘল আমল থেকে আজকের প্রকাশনা শিল্প: যেভাবে পাল্টে গেল বাঙালির প্রাণের বাংলাবাজার

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বাংলাবাজারে প্রবেশ করা মানে একাধিক গলির ভেতর হারিয়ে যাওয়া। এখানে একটি গলির যেন মাথা ঢুকে পড়ে আরেকটির ভেতর। তারপর আবার নতুন এক বাঁক'; সব মিলিয়ে বলতে গেলে অলিগলির কোনও মায়াজাল। ৩৭, ৩৮, আবার ৩৭–এর ক, খ এরকম সংখ্যা আর অক্ষরের এই গোলকধাঁধায় দিকচিহ্ন নয় বরং বিভ্রান্তিই নিত্যসঙ্গী। তবে আশ্চর্য বিষয়, এই বিভ্রান্তির মাঝেই আছে এক ধরনের নিশ্চয়তা। মানচিত্র এখানে কাজ করে না বরং কাজ করে ইন্দ্রিয়। এখানে দিক হারিয়ে গেলেও গলিতে পা রাখলেই নাকে আসে নতুন বইয়ের গন্ধ। যেন পথ নিজেই স্বাগত জানায় যে আপনি বাংলাবাজারে প্রবেশ করেছেন।

চারপাশে চোখ ঘুরালেই সারি সারি বইয়ের দোকান। কোনওটা অন্ধকার, কোনওটা আলো-ঝলমলে, কোথাও বইয়েঠাঁসা তাক, আবার কোথাও মেঝেতে জমে আছে বইয়ের স্তূপ। দোকানের ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে অগণিত মলাট। এখানে নতুন বইয়ের চকচকে রং আর পুরাতন বইয়ের বিবর্ণ পাতা একইসঙ্গে যেন বিশ্রাম নেয়; এর নামই বাংলাবাজার, শান্ত শুনালেও মোটেও এমন নয়। বাংলাবাজারের আছে নিজস্ব গতি। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি এলেই এর গতি আরও বেড়ে যায়। পুরান ঢাকার অলিগলিতে অভ্যস্ত না হলে পথ হারানোই স্বাভাবিক। তবে একটু পরেই বোঝা যায় এখানে পথ চেনা শিখতে কেউ তাড়া দেয় না। বাংলাবাজারের অলিগলির বাঁকে জমে আছে সময় ও ইতিহাসের গল্প।
বাঙালির বাজার থেকে বাংলাবাজার
বাংলাবাজার নামটি কীভাবে এলো এটি স্পষ্ট নয়। পুরান বিভিন্ন বই ও গবেষকরা বিভিন্ন অনুমান করেন নামের ইতিহাস নিয়ে। ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক মুনতাসির মামুন তার 'ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী' গ্রন্থে মত দিয়েছেন যে, মুঘল আমলে যখন ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানী হয়, তখন ইসলাম খান চিশতির আগমনের আগে থেকেই এখানে একটি ছোট শহর বা জনপদ ছিল। সেই জনপদে স্থানীয় বাঙালিরা বাস করতেন এবং তাদের কেনাকাটার জন্য যে বাজারটি গড়ে উঠেছিল, সেটিই সম্ভবত 'বাংলাবাজার'। এটি মুঘলদের আগমনের আগের 'পুরাতন ঢাকা'র অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়।
ইতিহাসের গভীরে বাংলাবাজার
মুঘল আমলের আগে বাংলাবাজার এলাকা ছিল ঢাকার একটি অতি পুরাতন অংশ। সেই যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র ছিল এখানে। আজ যে গলিতে বইয়ের দোকান একদিন সেখানে ছিল চাল, কাপড় আর নিত্যপণ্যের আড়ত। এরপর ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে মোগল শাসনামলে বুড়িগঙ্গাকেন্দ্রিক পুরান ঢাকা গড়ে উঠে বাণিজ্যনগরী হিসেবে। কেননা, নদীপথই ছিল তখন প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা।
১৬১০ সালে মুঘল সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে স্থাপন করেন। ১৮৬০ সালে ঢাকায় প্রথম ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’ অর্থাৎ ছাপাখানা স্থাপিত হয়। ১৮৬৫ থেকে ১৯০০ সালে কলকাতার বটতলার পুঁথির আদলে পার্শ্ববর্তী চকবাজারে গড়ে উঠে অগনিত মুসলমানি পুঁথি যা বাংলাবাজারকে বইয়ের সঙ্গে প্রথমবারের মতো জুড়ে দেয়।
সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৭ সালে ধীরে ধীরে বইয়ের দোকান গড়ে ওঠে। হরিশচন্দ্র মিত্র সম্পাদিত ‘কবিতাকুসুমাবলি’ বিক্রির কেন্দ্রও ছিল বাংলাবাজার। ব্রিটিশ শাসনামলের ১৯ শতকের শুরু থেকে ঢাকায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার শুরু হয়। ধীরে ধীরে ধর্মীয় পুস্তক, পাঠশালা-কেন্দ্রিক বই এবং হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির চাহিদা বাড়তে থাকে।
ওই সময় অর্থাৎ ১৮৫০ থেকে ১৮৬০ দশকের মধ্যেই বাংলাবাজারে বই বিক্রির স্থায়ী দোকান গড়ে ওঠে। চকবাজার, পাটুয়াটুলী ও মোগলটুলীতে গড়ে ওঠা ধর্মীয় পুস্তকের দোকানগুলোও পরবর্তীকালে এখানে চলে আসে।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বাংলাবাজারকে নতুন অধ্যায়ে নিয়ে আসে। লেখক, অধ্যাপক, ছাত্রদের আনাগোনা শহরের বইয়ের বাজারকে চাঙ্গা করে তুলে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের কলকাতা থেকে বহু প্রকাশক ও মুদ্রণকর্মী ঢাকায় চলে আসেন। প্রকাশনাশিল্প তখন নতুন উদ্দীপনা পায়। কলকাতা থেকে প্রকাশকরা বাংলাবাজারে ব্যবসা শুরু করেন নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট ওয়েজ, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, আল হামারা লাইব্রেরি, মালিক লাইব্রেরি—এই প্রতিষ্ঠানগুলো নব উদ্যমের সঙ্গে বাংলা প্রকাশনাশিল্পে যুক্ত হয়।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বইয়ের বাজার মূলত পাঠ্যপুস্তক ও সৃজনশীল সাহিত্য দুই ধারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, কবিতার বই জায়গা করে নেয় তাকজুড়ে।
ষাট-সত্তরের বাংলাবাজার ছিল একতলা, বেশিরভাগ টিন ও চুন-মাটির ঘর। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর রড-সিমেন্টের দালান তৈরি হয়। মান্নান মার্কেট, ইসলামি টাওয়ার, ৩৮ নম্বর মার্কেটসহ বহুতল মার্কেট গড়ে ওঠে।
তখন প্রকাশকরা শুধু ব্যবসায়ী নয় ছিলেন লেখক ও সৃজনশীল মানুষ। শিশু সাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী (নওরোজ কিতাবিস্তান), প্রাবন্ধিক বরকত উল্লাহ (গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি), কবি মঈনুদ্দিন (আল হামারা লাইব্রেরি) প্রভৃতি। শহীদ কাদরির প্রথম কবিতার বই, নির্মলেন্দু গুণ ও হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই সবই বাংলাবাজারের হাত ধরে এসেছে পাঠকের কাছে।
তরুণ প্রকাশকরা আশির দশক থেকে নব্বইয়ের শুরু পর্যন্ত বিদ্যাপ্রকাশ, আফসার ব্রাদার্স, অনুপম, আগামী, অনন্যা, পল্লব, দিব্যপ্রকাশ, প্রতীক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। হুমায়ূন আহমেদ ও ইমদাদুল হক মিলনের কাজের কারণে বইয়ের সংখ্যা ও সংস্করণের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়।
পড়া, আড্ডা ও মানুষের গল্প
বাংলাবাজার শুধু বইয়ের কেন্দ্র নয় এটি লেখক ও পাঠকের আড্ডাস্থলও ছিল। ১৯২৫ সালে বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রগতি’ প্রকাশিত হয়েছিল ২৬ নম্বর বাংলাবাজার থেকে। সেসময় স্টুডেন্ট ওয়েজ, নওরোজ কিতাবিস্তান, বিউটি বোর্ডিং—এসব স্থান ছিল লেখক-শিল্পীদের নিয়মিত আড্ডা। সৈয়দ শামসুল হক তার ‘তিন পয়সার জ্যোৎস্না’তে সেই সময়ের দিনরাত্রি চিত্রিত করেছেন।
ষাট-সত্তরের প্রকাশকরা স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন তরুণ লেখকরা লেখাপত্র নিয়ে এখানে আসতেন আর প্রকাশকরা সরাসরি তাদের বাড়িতে গিয়ে বই নিয়ে আসতেন। কবি ও লেখক যাদের লেখা বাংলাবাজারে প্রকাশিত হয়েছেন: জসীমউদ্দীন, আবু ইসহাক, সরদার জয়েন উদ্দীন, সত্যেন সেন, আবুল ফজল, আবুল মনসুর আহমদ, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, শওকত আলী, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, শহীদুল জহির, শাহাদুজ্জামান, শাহীন আখতার।

আজকের বাংলাবাজার
বাংলাবাজারে এখন প্রায় দুই হাজারের বেশি বইয়ের দোকান ও চার শতাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিদিন কোটি টাকার মতো বই বিক্রি হয়, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রি আরও বাড়ে। এখান থেকে পাঠ্যপুস্তক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়, যায় দেশের বাইরেও।
এখানে জীবিকা নির্বাহ করেন লক্ষাধিক মানুষ বিক্রেতা, প্রকাশক, মুদ্রণশিল্পী, লেমিনেশন ও বাঁধাই শ্রমিক। প্রতিদিন হাজারো মানুষ একসাথে বই আনছে, বই নিয়ে যাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, নতুন বই খুঁজছে।
বাংলাবাজার বোঝাপড়ার জায়গা। বাংলাবাজার মানে শুধুই বইয়ের বাজার নয়, 'বই শিল্প এলাকা' বললেও হয়তো ভুল হবে না। যতদিন মানুষ পড়বে, ভাববে ও প্রশ্ন করবে ততদিন এই গলিপথ, এই বইয়ের ঘ্রাণে ভরা পথ, বাংলাবাজার, জীবন্ত থাকবে। বইপ্রেমীরাও আসবে, তার বই খুঁজবে, দেখবে, বইয়ের জন্য বাংলাবাজারের গলিতে হারাবে, হয়তো গাইবে,
পথ হারাবো বলেই এবার
পথে নেমেছি
সোজা পথের ধাঁধায়
আমি অনেক ধেঁধেছি
পথ হারাবো বলেই এবার
পথে নেমেছি।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.