মস্তিষ্কের নিজস্ব ‘ইরাস ট্যুর’: আপনার বয়স কি এখন টার্নিং পয়েন্টে?

প্রকাশ :
সংশোধিত :

আমরা সাধারণত ভাবি বয়স বৃদ্ধি মানেই শরীর ধীরে ধীরে পুরোনো হওয়া—একটানা, একঘেয়ে একটা প্রক্রিয়া। যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে না থেকে শুধু সামনেই এগিয়ে চলেছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মানুষের শরীর আর মস্তিষ্ক এতটা সরল পথে হাঁটে না। বরং জীবনের বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ হঠাৎ বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।
সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের একদল বিজ্ঞানী মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে এমনই এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। তাদের গবেষণা বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক পুরো জীবনজুড়ে একটানা পরিবর্তিত হয় না, বরং জীবনের বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি আলাদা ‘যুগ’ বা ‘এরা’ পার করে থাকে। অনেকটা জনপ্রিয় শিল্পীদের জীবনের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে করা কনসার্ট ট্যুরের মতো। গবেষকরা মজা করে এর নাম দিয়েছেন মস্তিষ্কের নিজস্ব ‘ইরাস ট্যুর’।
এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জার্নাল নেচার কমিউনিকেশনস-এ। গবেষণার প্রধান লেখক অ্যালেক্সা মুসলে জানান, মানুষের মস্তিষ্কের সংযোগ বা ‘ওয়ারিং’ আমাদের চিন্তা, আচরণ ও বিকাশের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত পুরো জীবনজুড়ে এই সংযোগগুলো কীভাবে বদলায়—সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এই গবেষণাই প্রথমবারের মতো মানুষের জীবনে মস্তিষ্কের বড় বড় পরিবর্তনের ধাপগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছে।
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন বিশেষ ধরনের এমআরআই প্রযুক্তি, যাকে বলা হয় ডিফিউশন ইমেজিং। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের ভেতরে পানির অণুগুলো কীভাবে চলাচল করে, তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। কারণ, পানির এই গতিপথের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বোঝা যায় মস্তিষ্কের গঠন ও সংযোগে কী ধরনের রদবদল হচ্ছে।
এই গবেষণায় প্রায় চার হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বয়সের সীমা ছিল কয়েক মাসের শিশু থেকে শুরু করে ৯০ বছরের প্রবীণ পর্যন্ত। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক জীবনের চারটি বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পার করে।
প্রথম যুগটি শুরু হয় জন্মের পর থেকে প্রায় নয় বছর বয়স পর্যন্ত। এই সময়টায় শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গড়ে ওঠে। ধূসর ও সাদা মস্তিষ্ক পদার্থ দ্রুত বৃদ্ধি পায়, আর স্নায়ুর সংযোগগুলো একে অপরের সঙ্গে শক্তভাবে যুক্ত হতে থাকে। এই সময়েই ভাষা শেখা, অনুভূতি বোঝা, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মতো মৌলিক ক্ষমতাগুলো তৈরি হয়।
এরপর আসে দীর্ঘ এক ধাপ, যাকে বলা যায় কিশোর-তরুণ যুগ। অনেকেই জানেন, মানুষের মস্তিষ্ক ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত পুরোপুরি পরিপূর্ণ হয় না। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধাপটি আসলে গড়ে প্রায় ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মানে এই নয় যে ত্রিশের কোঠায় থাকা মানুষরা কিশোরদের মতো আচরণ করেন। বরং তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও সংযোগের ধরনে কিছু মিল থাকে। এই সময়ে মস্তিষ্ক আরও দক্ষ হয়, অপ্রয়োজনীয় সংযোগ বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোকে আরও শক্তিশালী করে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে চলে প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের যুগ—যেটি এই চারটি যুগের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ। এই সময়ে মস্তিষ্কের দক্ষতা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে। চিন্তা-ভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্মৃতি; সবকিছুই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় বিরাজ করে।
তবে বড় পরিবর্তন আসে প্রায় ৬৬ বছর বয়সের কাছাকাছি সময়ে। এই সময়টিকে গবেষকরা বলছেন ‘প্রারম্ভিক বার্ধক্য’। এখানে মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। স্মৃতিশক্তি কিছুটা কমে আসতে পারে, তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সময় বেশি লাগতে পারে।
সবশেষ যুগটি শুরু হয় প্রায় ৮৩ বছর বয়সের পর। একে বলা হচ্ছে ‘চূড়ান্ত বার্ধক্য’। এই ধাপে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এবং স্নায়ু সংযোগের দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো হয়ে যায়।
কেমব্রিজের আরেক গবেষক ডানকান অ্যাস্টল বলেন, আমরা অনেকেই নিজের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখি—শৈশব, যৌবন, মধ্য বয়স, বার্ধক্য সবই যেন আলাদা আলাদা অধ্যায়।
গবেষণাটি দেখাচ্ছে, আমাদের মস্তিষ্কও ঠিক একইভাবে আলাদা আলাদা অধ্যায়ের ভেতর দিয়ে যায়। মস্তিষ্কের পরিবর্তন কোনও ধীর, সরল রেখার মতো নয়; বরং কিছু নির্দিষ্ট মোড়ে বড় পরিবর্তন ঘটে।
এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য, স্নায়ুবিক রোগ এবং বার্ধক্যজনিত সমস্যাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোন বয়সে মস্তিষ্ক বেশি সংবেদনশীল, কোন সময়টায় বেশি যত্ন দরকার—এই ধারণাগুলো চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মানুষের মস্তিষ্ক শুধু বয়সের ভারে ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয় না। বরং জীবনের নানা সময়ে সে নিজস্ব ছন্দে রূপ বদলায়—নিজস্ব এক ‘ইরাস ট্যুর’-এ ঘুরে বেড়ায়।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.