লিচু কেন খাবেন? জেনে নিন এর বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

নরম, রসালো আর মিষ্টি স্বাদের লিচু দেশের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন ফল। জ্যৈষ্ঠের তীব্র গরমে এক থোকা লাল টকটকে লিচু শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, বরং শরীরকে চাঙ্গা রাখতেও সহায়তা করে। দিনাজপুর, পাবনা বা সোনারগাঁওয়ের লিচুর সুখ্যাতি দেশজুড়ে। তবে লিচু কেবল খেতেই সুস্বাদু নয়, এর পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও অনেক। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গবেষণায় ওঠে এসেছে এর নানাবিধ ঔষধি ও পুষ্টিগুণের কথা। তাহলে জেনে নেয়া যাক, বাংলাদেশের এই মৌসুমি ফল কেন আমাদের খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।
লিচু আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও কোলাজেন তৈরি করে
লিচু ভিটামিন ‘সি’-এর একটি পাওয়ার হাউস। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুতে প্রায় ৭২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক চাহিদার প্রায় শতভাগ পূরণ করতে পারে।
জার্নাল অব ফাংশনাল ফুডস-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, লিচুতে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি শরীরের শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বাড়িয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়া, এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ও কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, যা অকাল বার্ধক্য রোধ করে।
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। লিচুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম এবং ‘অলিগোনল’ নামক একটি উপাদান। পটাশিয়াম রক্তনালীর চাপ কমিয়ে রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ক্যানসার প্রতিরোধে এর ভূমিকা
লিচুতে রয়েছে পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
চিনের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ২০০৬ সালে ভেষজ ফলের ওপর একটি বিস্তারিত গবেষণা করেন। সেখানে দেখা যায়, লিচুর খোসা এবং বীজের নির্যাসে থাকা পলিফেনলিক উপাদান ক্যানসার কোষের বিস্তার রোধে ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে স্তন ক্যানসার ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে এটি আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।
হজমশক্তি বৃদ্ধি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসে গ্যাস্ট্রিক বা হজমের সমস্যা খুবই সাধারণ। লিচুতে থাকা আমাদের ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশ পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। তাছাড়া, লিচুতে ক্যালরির পরিমাণ কম এবং পানির পরিমাণ বেশি (প্রায় ৮২%) হওয়ায় এটি ওজন কমাতেও সাহায্য করে।
স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে
লিচুতে প্র-এন্থোসায়ানাইডিনস নামক এক ধরনের উপাদান থাকে যা রক্তনালীকে সুস্থ রাখে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, নিয়মিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভোনয়েড সমৃদ্ধ ফল (যেমন লিচু) গ্রহণ করলে তা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
সতর্কবার্তা: যা মনে রাখা জরুরি
লিচু যেমন উপকারী, তেমনি এর কিছু সতর্কতাও রয়েছে। বিশেষ করে খালি পেটে কাঁচা বা আধপাকা লিচু খাওয়া একদমই উচিত নয়।
২০১৪ সালে ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি এর গবেষকদের যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কাঁচা লিচুতে ‘হাইপোগ্লাইসিন এ’ এবং ‘এমসিপিজি’ নামক উপাদান থাকে, যা খালি পেটে খেলে রক্তে শর্করার পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক হতে পারে। তাই সবসময় ভরা পেটে পাকা লিচু খাওয়া নিরাপদ।
পুষ্টিগুণে ভরপুর লিচু আমাদের জন্য এক দারুণ আশীর্বাদ। পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিক নিয়মে পাকা লিচু খেলে তা এই গরমে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করবে। তবে অবশ্যই আপনি কোন ফলটি খাবেন আর কোনটি খাবেন না তা ডাক্তারের পরামর্শ মেনেই খাওয়া উচিত।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.