কেন নিজেদের এত সুখী দেখানোর চেষ্টা?

প্রকাশ :
সংশোধিত :

কখনও খেয়াল করেছেন, চারপাশে সবাই যেন অদ্ভুতভাবে খুব সুখী? ফেসবুক স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে হাসিমুখ, রেস্তোরাঁর ঝলমলে ছবি, 'লাইফ ইজ বিউটিফুল' টাইপ ক্যাপশন। কেউ ঘুরতে গেছে, কেউ প্রেমে পড়েছে, কেউ নতুন কিছু কিনেছে- সবকিছুতেই যেন একধরনের পরিপূর্ণ সুখের প্রদর্শনী। অথচ বাস্তবে পাশে বসা মানুষটার সঙ্গেই কথা বললে বোঝা যায়, গল্পটা এত সরল নয়।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়, কেন আমরা নিজেদের এত সুখী দেখানোর চেষ্টা করি?
প্রথমত, এখানে আছে এক ধরনের সামাজিক চাপ। সমাজ সবসময় একটা নির্দিষ্ট ছাঁচ তৈরি করে দেয়—কেমন হলে 'ভালো থাকা' বলে মনে হবে। ভালো চাকরি, সম্পর্ক, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—এই সবকিছু মিলিয়ে একটা ‘পারফেক্ট লাইফ’-এর ধারণা। এই ধারণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা কাজ করে। কেউ পিছিয়ে পড়তে চায় না। ফলে নিজের ভেতরের অস্থিরতা, দুঃখ বা হতাশা লুকিয়ে রেখে একটা সাজানো ছবি তুলে ধরা হয়।
এই সাজানোর প্রক্রিয়াটা সবচেয়ে দৃশ্যমান হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে কেউ কাঁদে না, কেউ ভেঙে পড়ে না—অথবা খুব কমই তা দেখায়। বরং জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো বেছে বেছে তুলে ধরা হয়। এতে একটা সমস্যা তৈরি হয়—অন্যরা ভাবতে শুরু করে, “সবাই তো ভালো আছে, শুধু আমিই বোধহয় নেই।” এই তুলনাটা একসময় নিজের ভেতরে চাপ তৈরি করে। তখন নিজের দুঃখটাকেও অস্বীকার করতে ইচ্ছে করে, কারণ সেটা যেন ‘স্বাভাবিক’ নয়।
দ্বিতীয়ত, সুখী দেখানোর মধ্যে একটা আত্মরক্ষার কৌশলও আছে। সবাই নিজের ভেতরের ভাঙাচোরা দিকগুলো প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কারণ, সমাজ এখনও মানসিক দুর্বলতাকে সহজভাবে নেয় না। কেউ যদি বলে, “আমি ভালো নেই”, তখন তাকে সহানুভূতি দেবার বদলে অনেক সময় বাজেভাবে বিচার করা হয়। ফলে অনেকেই নিজেদের কষ্ট চেপে রেখে হাসিমুখটা সামনে রাখে, যেন এটা একধরনের বর্ম।
এই বর্মের একটা অদ্ভুত দিক হলো, এটা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়। প্রথমে হয়তো অন্যদের চোখে ভালো দেখানোর জন্য হাসিমুখ রাখা হয়েছিল, কিন্তু একসময় সেটা নিজের কাছেও সত্যি বলে মনে হতে শুরু করে। নিজের কষ্টটাকে অস্বীকার করতে করতে মানুষ এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে সে বুঝতেই পারে না আসলে কী অনুভব করছে।
তৃতীয়ত, সুখী দেখানোটা অনেক সময় স্বীকৃতি পাওয়ার উপায়। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চায় তাকে কেউ লক্ষ্য করুক, প্রশংসা করুক। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ছবি পোস্ট করলে লাইক, কমেন্ট—এই ছোট ছোট প্রতিক্রিয়াগুলো একটা তাত্ক্ষণিক আনন্দ দেয়। এই আনন্দটা আসলে খুব সাময়িক, কিন্তু তবুও তা নেশার মতো কাজ করে। ফলে মানুষ বারবার সেই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য নিজেদের ‘সুখী’ ভার্সনটা সামনে আনে।
কিন্তু এর একটা বিপদও আছে। যখন নিজের বাস্তব অনুভূতি আর প্রদর্শিত জীবনের মধ্যে ফাঁকটা খুব বড় হয়ে যায়, তখন ভেতরে একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। বাইরে হাসি, ভেতরে অস্থিরতা—এই দ্বন্দ্বটা মানুষকে ক্লান্ত করে ফেলে। অনেক সময় এই ক্লান্তির কারণটাও ধরা পড়ে না, কারণ সবকিছু তো ‘ভালো’ দেখাচ্ছে!
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আমরা নিজেরাই সুখের সংজ্ঞাটা খুব সংকীর্ণ করে ফেলেছি। আমরা ভাবি, সুখ মানেই সবকিছু ঠিকঠাক থাকা, কোনো সমস্যা না থাকা। কিন্তু বাস্তবে সুখ এতটা সরল নয়। জীবনে দুঃখ থাকবে, হতাশা থাকবে, অনিশ্চয়তা থাকবে—এসবের মাঝেও ছোট ছোট মুহূর্তে আনন্দ খুঁজে পাওয়াটাই আসল সুখ। কিন্তু আমরা সেই জটিলতাকে মেনে নিতে চাই না। আমরা একটা সহজ, ঝকঝকে, ফিল্টার দেওয়া সুখ চাই।
এই জায়গাটাতেই সমস্যা। কারণ বাস্তব জীবন ফিল্টার মেনে চলে না। সেখানে অগোছালো দিন থাকে, ব্যর্থতা থাকে, একাকীত্ব থাকে। এগুলোকে অস্বীকার করে শুধু ‘সুখী’ মুখটা দেখাতে থাকলে, একসময় সেই মুখটাই ভারী হয়ে ওঠে।
তাহলে কি সুখী দেখানোর চেষ্টা পুরোপুরি ভুল? তা নয়। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের ভালো দিকগুলো তুলে ধরতে চায়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেটা বাস্তবতাকে আড়াল করে ফেলে। যখন আমরা নিজেদের কাছেই সত্যিটা লুকাতে শুরু করি।
হয়তো দরকার একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। সবসময় সুখী দেখানোর বদলে, কখনো কখনো স্বীকার করা—“আজ ভালো লাগছে না”—এটাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে দুর্বলতা প্রকাশ পায় না, বরং একটা মানবিকতা প্রকাশ পায়। কারণ বাস্তবে কেউই সবসময় সুখী থাকে না।
শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটা আসলে অন্য জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়—আমরা কি সত্যিই সুখী হতে চাই, নাকি শুধু সুখী দেখাতে চাই? এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটা যতদিন না পরিষ্কার হচ্ছে, ততদিন এই অভিনয় চলতেই থাকবে।
হয়তো একদিন আমরা শিখবো সুখ মানে নিখুঁত জীবন নয়, বরং অসম্পূর্ণতার মধ্যেও নিজের মতো করে বেঁচে থাকা। আর তখন হয়তো এতটা চেষ্টা করতে হবে না নিজেদের সুখী প্রমাণ করার জন্য। সুখটা তখন একটু বেশি সত্যি হবে, আর প্রদর্শনীটা হবে একটু কম।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.