বিশ্বের প্রাচীন পাঁচ লাইব্রেরি 

কাগজ ছিল না, ছিল না কলম: যেভাবে সংরক্ষিত ছিল হাজার বছরের জ্ঞান

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি ছবি : ছবিটি জেমিনাই এআই দিয়ে তৈরি

প্রকাশ :

সংশোধিত :

মানুষ যখন কাগজের বই পড়তে শেখেনি, তখনও সে জ্ঞান জমাতো।মাটির ফলকে, পাথরে কিংবা তালপাতায়। সেই জ্ঞান রাখার জায়গাই ছিল লাইব্রেরি।

নীরব ঘর। কিন্তু ভেতরে শব্দের পাহাড়। আজকের আধুনিক লাইব্রেরির শিকড় আসলে হাজার হাজার বছর আগের গড়া। চলুন, গল্পের মতো করে ঘুরে আসি বিশ্বের প্রাচীন পাঁচটি লাইব্রেরিতে।

আশুরবানিপালের লাইব্রেরি: অবস্থান: নিনেভে, বর্তমান ইরাক (খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দী)

আশুরবানিপাল ছিলেন আসিরীয় সাম্রাজ্যের শেষ মহান রাজা। অন্য রাজারা যেখানে যুদ্ধ আর দখলে ব্যস্ত ছিলেন, তিনি সেখানে বই সংগ্রহে মন দেন। এই লাইব্রেরি ছিল রাজপ্রাসাদের ভেতরে।

এখানে পাওয়া যায় প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মাটির ফলক। এই ফলকগুলো ছিল পোড়া কাদামাটি দিয়ে বানানো। আগুনেই এগুলো আরও শক্ত হয়ে যেত। ফলকগুলোতে ছিল—ধর্মীয় আচার, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিদ্যা, আইন ও মহাকাব্য। সবচেয়ে বিখ্যাত লেখাটি হলো গিলগামেশ মহাকাব্য। এটি মানবসভ্যতার প্রাচীনতম সাহিত্যগুলোর একটি।

এই লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এর ফলকগুলো বিষয়ভিত্তিক সাজানো ছিল যা এক ধরনের প্রাচীন ক্যাটালগ সিস্টেমও বলা যায়। এই কারণেই একে অনেকেই পৃথিবীর প্রথম আধুনিক লাইব্রেরিও বলে থাকেন।

আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রেট লাইব্রেরি: অবস্থান: মিসর (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী)

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি শুধু একটি জায়গা ছিল না। এটি ছিল স্বপ্নের মতো।

গ্রিক শাসক টলেমি পৃথিবীর সব জ্ঞান এক ছাদের নিচে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। যেই জাহাজে করে আলেকজান্দ্রিয়ার বন্দরে ঢুকতো, তার বই নিয়ে নেয়া হতো। মূল কপি রেখে, নকল ফেরত দেয়া হতো তাদের হাতে।

এখানে কাজ করেছেন—ইউক্লিড (জ্যামিতি), এরাটোস্থেনিস (যিনি পৃথিবীর পরিধি মাপেন), হিপার্কাস (জ্যোতির্বিদ্যা)। লাইব্রেরিতে ছিল লক্ষাধিক পাণ্ডুলিপি। সব প্যাপিরাসে সংরক্ষণ করে রাখা হতো। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—এই লাইব্রেরির ধ্বংস। আগুনে, যুদ্ধে, অবহেলায়—ধীরে ধীরে সব হারিয়ে যায়। আজ এটি নেই। কিন্তু জ্ঞানের ইতিহাসে এর ছায়া এখনও বিদ্যমান।

নালন্দা মহাবিহারের লাইব্রেরি: অবস্থান, বিহার, ভারত (৫ম–১২শ শতাব্দী)

নালন্দা ছিল বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। এখানে ছাত্ররা থাকতো, পড়াশোনা ও গবেষণা করতো। এর লাইব্রেরির নাম ছিল ধর্মগঞ্জ। ছিলো তিনটি প্রধান ভবন- রত্নসাগর, রত্নরঞ্জক ও রত্নোদধি। রত্নোদধি ছিল নয়তলা উঁচু যা সে সময়ের জন্য অকল্পনীয়। এখানে পড়ানো হতো—বৌদ্ধ দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যা (আয়ুর্বেদ), গণিত, যুক্তিবিদ্যা, ভাষাবিজ্ঞান। চীন থেকে আগত পরিব্রাজক হিউয়েন সাং নালন্দার প্রশংসা করেছিলেন।

১২শ শতকে তুর্কিদের আক্রমণে এই লাইব্রেরি পুড়ে যায়। বলা হয়, বইয়ের আগুন জ্বলেছিল মাসের পর মাস। নালন্দা আমাদের শেখায়—একটি সভ্যতা ধ্বংস হতে সময় লাগে না।

পারগামনের লাইব্রেরি: অবস্থান, বর্তমান তুরস্ক (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী)

পারগামন ছিল এক সময় জ্ঞানচর্চার বড় কেন্দ্র। এটি ছিলো আলেকজান্দ্রিয়ার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। এখানে প্রায় ২ লাখ পাণ্ডুলিপি ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু মিসর যখন প্যাপিরাস রপ্তানি বন্ধ করে দেয়, তখন পারগামনে নতুন উপায় খোঁজা শুরু হয়।

সেখান থেকেই জনপ্রিয় হয় পার্চমেন্ট অর্থাৎ পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি লেখার উপকরণ। পারগামনের লাইব্রেরি দেখায়— প্রযুক্তির উদ্ভাবন অনেক সময় সংকট থেকেই আসে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এই লাইব্রেরির গুরুত্ব কমে আসে।

বায়তুল হিকমা: অবস্থান: বাগদাদ (৯ম–১৩শ শতাব্দী)

ইসলামি স্বর্ণযুগের হৃদয় ছিল বায়তুল হিকমা। এটি ছিল লাইব্রেরি, গবেষণাকেন্দ্র ও অনুবাদ প্রতিষ্ঠান। এখানে অনূদিত হয়—গ্রিক দর্শন, ভারতীয় গণিত ও পারস্যের বিজ্ঞান। এখান থেকেই বীজগণিতের ভিত্তি গড়ে ওঠে। শূণ্যের ধারণা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে।

১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের আক্রমণে বাগদাদ ধ্বংস হয়। বলা হয়, সে সময় টাইগ্রিস নদী নাকি লেখার কালি দিয়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। এটি ছিল জ্ঞানচর্চার ওপর সবচেয়ে ইতিহাসে হওয়া নির্মম আঘাতগুলোর একটি। সব মিলিয়ে এ কথা বলা যায়, এই লাইব্রেরিগুলো শুধু ইট-পাথরের ঘর ছিল না। এগুলো ছিল মানুষের চিন্তার ঘর।

স্বপ্নের ঘর। আজ আমরা ডিজিটাল যুগে বাস করি, তবু লাইব্রেরির প্রয়োজন ফুরায়নি। কারণ, জ্ঞান শুধু তথ্য নয়—এটি স্মৃতি ও সভ্যতা মূল। আর সেই সভ্যতার প্রথম বাতিঘর ছিল এই প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো।

সর্বশেষ খবর