হোবা ঘোষের রসগোল্লা: রাজশাহীর মিষ্টি স্বাদের চিরন্তন ঠিকানা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

রাজশাহী শুধু তাজা আম আর পুরনো ইতিহাসের শহর নয়। এটি মিষ্টির শহরও বটে। আর শহরের মিষ্টির মধ্যে এক নাম বিশেষভাবে মুখে মুখে থাকে হোবা ঘোষের রসগোল্লা।
শহরের কোর্ট চত্বর এলাকায়, এক ছোট্ট দোকান বা ছাউনির নিচে, এই রসগোল্লা বিক্রি হয়। দোকানটির কোনও বড়ো সাইনবোর্ড নেই, নেই কোনও ঝকঝকে সাজ‑সজ্জা। শুধু মিষ্টি আর মানুষের ভিড়। তবে এই সরলতার মধ্যে লুকিয়ে আছে স্বাদ ও ইতিহাসের গভীরতা।

হোবা ঘোষ: স্বাদের মানুষ
হোবা ঘোষ সেই ব্যক্তি, যিনি প্রায় ৬৬ বছর ধরে এই রসগোল্লার স্বাদ ধরে রেখেছেন। বয়স এখন প্রায় ৮০ হলেও, তিনি এখনও সকালের প্রথম আলোতেই দুধ থেকে ছানা তৈরি, রসগোল্লা গঠন, সিরা ফোটানো সব কাজই নিজের হাতে করেন।
এই দোকানটা বড়ো বা দামী নয়। বরং এর সরলতা এবং খাঁটি স্বাদই মানুষের কাছে প্রিয়। দোকানের নামের পাশে ছোট্ট একটি ফোন নম্বর, সেটাই এই রসগোল্লার পরিচয়।
হোবা ঘোষের বাড়ি রাজশাহী নগরের বুলনপুর ঘোষপাড়ায়। তাঁর বাবার নাম লাড্ডু ঘোষ। আর দাদুর নাম উমাচরণ ঘোষ। দাদুই ১৯৩৭ সালের দিকে মিষ্টিটা চালু করেছিলেন। হোবা ঘোষের বাবা-কাকারা ছিলেন চার ভাই। চার ভাইয়ের ১৯ ছেলে। এই ১৯ জনের একজন হচ্ছেন হোবা ঘোষ। তাঁর দুই ছেলে বিমল কুমার ঘোষ ও অমল কুমার ঘোষও বাবার সঙ্গে মিষ্টির ব্যবসাই করেন।
এ ছাড়া রাজশাহী আদালত চত্বরে যত মিষ্টির দোকান আছে, সবই তাঁদের বংশের লোকদের।
রাজশাহী সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দেয়ালের পাশে কয়েকটি টুল পেতে বসেন হোবা ঘোষ। খদ্দেরদের জন্য রয়েছে আলাদা টুল। তাঁরা টুলে বসে রসগোল্লার রসে পাউরুটি ডুবিয়ে তৃপ্তি করে খান।

স্বাদে আলাদা কী আছে?
অনেক লোকের মতে, হোবা ঘোষের রসগোল্লা সাধারণ রসগোল্লার মতো হলেও খাওয়ার পর মনে হয়—“এটাই খাঁটি, নরম, এবং পরিপূর্ণ স্বাদ।”
স্বাদকে আলাদা করে যেসব দিক—খাঁটি ছানা ব্যবহার, নরম ও তুলতুলে টেক্সচার, পরিমিত সিরার মিষ্টতা খাঁটি দুধের প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা। এই উপাদানগুলো একসাথে মিলে তৈরি করে এমন অভিজ্ঞতা যা ভোলা যায় না। একবার খেয়ে যাওয়া মানুষ বারবার ফিরে আসে এই মিষ্টির টানে।
জনপ্রিয়তার কারণ
এই রসগোল্লা শুধু স্থানীয় মানুষদের প্রিয় নয়। এখানে আসেন সরকারি ও বেসরকারি কর্মী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী—সব ধরনের মানুষ।
যারা শহরে কাজ বা সফরে আসেন, তারা প্রায়ই এই রসগোল্লা খেতে এখানে উপস্থিত হন। কেউ অতিথি আপ্যায়ন করতে চাইলে, প্রথমেই চলে আসে হোবা ঘোষের রসগোল্লার নাম। অনেকে আবার দূর থেকে অর্ডার দিয়ে পাঠান। কেউ কেউ গিফট হিসাবেও কিনে নিয়ে যান।
ঐতিহ্য বনাম সময়
সময় বদলেছে। শহর বড় হয়েছে। নতুন নতুন মিষ্টির দোকান এসেছে। বড়ো রেস্তোরাঁ, নতুন ফ্লেভার, কফি‑চা‑সাথে মিষ্টি—সবকিছু এসেছে। তবুও হোবা ঘোষের রসগোল্লা পরিচিত স্বাদ ও খাঁটি দুধের স্নিগ্ধতায় অটুট। দাম বেড়েছে, কিন্তু স্বাদ রয়েছে আগের মতোই। শহরের মানুষ আজও লাইন ধরে দাঁড়ান, রসগোল্লা কিনে ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
মিষ্টিতে শহরের পরিচয়
রসগোল্লার মূল ইতিহাসের কথা বললে, এটি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম জনপ্রিয় মিষ্টি। ১৮৬৮ সালে কলকাতার নবীন চন্দ্র দাস প্রথম তৈরি করেন স্পঞ্জি রসগোল্লা, যার পরে এটি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলার মিষ্টির মধ্যে রসগোল্লার গুরুত্ব অনেক। তবে রাজশাহীর মতো জায়গায় নিজস্ব মিষ্টির সংস্কৃতি গড়ে ওঠাটা বিশেষ। এখানে লোকেরা মিষ্টি তৈরি করার পদ্ধতি, খাঁটি উপাদান ব্যবহার এবং স্বাদ রক্ষার জন্য অতীতের রেসিপি আজও মেনে চলেন।
রসগোল্লা বাংলার মানুষের অন্যতম প্রিয় মিষ্টি। নানা শহরে নানা স্বাদ পাওয়া যায়। কিন্তু রাজশাহীর হোবা ঘোষের রসগোল্লা আলাদা, কারণ এটি কেবল মিষ্টি নয়। এটি একটি গল্প, একটি স্মৃতি, শহরের পরিচয়। ছোট্ট দোকান হলেও, এর স্বাদ শহরের মানুষের হৃদয়ে বড়ো জায়গা দখল করেছে।
দিনের শুরু হোক বা শেষ, রাজশাহী শহরকে মিষ্টির স্বাদ দিয়ে মনে রাখার নামই হোবা ঘোষের রসগোল্লা।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.