হিট স্ট্রোক এর ঝুঁকিতে বয়স্ক ও শিশুরা: এড়াতে যা করণীয়

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বছরের এই সময়টাতে প্রচণ্ড গরমে মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘরে বা বাইরে কোথাও যেন স্বস্তি মেলে না। ছোট বা বড় সব বয়সের মানুষের জন্যই অতিরিক্ত গরম শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত যারা কাজের জন্য বাইরে বের হন, তাদের কাছে হিট স্ট্রোক এ সময় এক আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে। সচেতনতা এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ আমাদের হিট স্ট্রোকের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন এমএইচ সমরিতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. স্বাক্ষর ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “হিট স্ট্রোক হলো এমন একটি জটিল শারীরিক অবস্থা, যখন অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায় (৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি) এবং শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এতে মস্তিষ্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
হিট স্ট্রোক কেন হয়?
অতিরিক্ত গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করা বা বেশি শক্তি ব্যয় হয় এমন কায়িক পরিশ্রম করলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তখন আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক সময় শরীরকে যথাযথভাবে ঠান্ডা করতে ব্যর্থ হয়।
তিনি বলেন, “আমাদের শরীর সাধারণত অতিরিক্ত তাপ ঘামের মাধ্যমে বের করে দিয়ে দেহের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু চারপাশের তাপমাত্রা যখন অনেক বেড়ে যায়, তখন শরীরের এই কুলিং সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোকের সম্ভাবনা দেখা দেয়।”
হিট স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণসমূহ
হিট স্ট্রোকের লক্ষণসমূহ সম্পর্কে জানা থাকলে আমরা সচেতন হতে পারি এবং খুব সহজেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারি। ফলে সম্ভাব্য শারীরিক জটিলতা বা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
- শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া
- মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরা
- বমিভাব বা বমি হওয়া
- আচরণে অস্বাভাবিকতা, বিভ্রান্তি বা অচেতন হয়ে পড়া
- দ্রুত হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস
- কখনও অতিরিক্ত ঘাম, আবার কখনো ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- চোখে ঝাপসা দেখা
- তন্দ্রাভাব
- রক্তচাপ কমে যাওয়া
- ত্বকের রঙ স্বাভাবিকের তুলনায় ফ্যাকাশে বা লালচে হয়ে যাওয়া
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
- বয়স্ক ও শিশু
- যারা রোদে কাজ করেন, যেমন শ্রমিক ও কৃষক
- ক্রীড়াবিদ বা যারা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করেন
- ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা স্থূলতায় ভোগা ব্যক্তি
- যারা পর্যাপ্ত পানি পান করেন না
প্রতিরোধে করণীয়
হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলা জরুরি, কারণ এটি প্রতিরোধযোগ্য।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল পান করা
গরমের দিনে আমাদের শরীর প্রচুর ঘামে এবং তীব্র গরমে সহজেই পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল পান করতে হবে। গ্রীষ্মকালে নানা রসালো ফল পাওয়া যায়; পানির পাশাপাশি এগুলোও খাওয়া যেতে পারে, যা শরীরের পানির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতিও পূরণ করে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি-শুধু পিপাসা লাগলেই পানি খাওয়া নয়, বরং প্রচণ্ড গরমে নিয়মিত বিরতিতে বারবার পানি পান করতে হবে।
দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদ এড়িয়ে চলা
দিনের এই সময়টাতে সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এই সময় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা উচিত এবং দিনের অন্যান্য সময়ে বাইরে কাজগুলো করার জন্য সময় ভাগ করে নেওয়া ভালো।
হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা
হালকা রঙের সুতির, নরম ও আরামদায়ক পোশাক তীব্র গরমের জন্য খুবই উপযুক্ত। আঁটসাঁট পোশাক পরলে শরীরে বাতাস চলাচল ঠিকমতো হয় না এবং শরীর সহজে ঠান্ডা হতে পারে না। তাই ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত।
ঘরের পরিবেশ ঠান্ডা রাখা
দিনের বেলায় রোদের সময় ঘরের পর্দা টেনে রাখা উচিত, এতে ঘর তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে। পাশাপাশি ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বাইরে কাজের সময় মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নেওয়া
প্রচণ্ড গরমে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে বিশ্রাম নেওয়া বা মন প্রফুল্ল রাখে এমন কোনো কাজ করা উচিত।
কেউ হঠাৎ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে কী করণীয়-এ বিষয়ে ডা. স্বাক্ষর বলেন, “হিট স্ট্রোক একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি। রোগীর শরীর দ্রুত ঠান্ডা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি করা অত্যন্ত জরুরি। দেরি হলে কিডনি, লিভারসহ অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
shabnamzabin018@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.