ফুটবল বিশ্বকাপের সময় কীভাবে বদলে যায় বাংলাদেশের স্লিপ-সাইকেল?

প্রকাশ :
সংশোধিত :

রাত একটা বাজে। হাবলংয়ের বাজারে মোস্তফা মামার চায়ের দোকানে তখনও আলো জ্বলছে। অথচ এই দোকান এমনিতে বন্ধ হয় রাত নয়টায়। বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশের সময়টাই আসলে একরকম জোর করে উল্টে দেওয়া হয় ব্রাজিল বা ইউরোপের মাটিতে টুর্নামেন্ট বসলে খেলা শুরু হয় গভীর রাতে, কখনো একেবারে ভোরের গায়ে গিয়ে ঠেকে। কাতার বিশ্বকাপ অবশ্য এক্ষেত্রে আলাদা ছিল; সময়ের দূরত্ব কম থাকায় ম্যাচ পড়েছিল বিকেল চারটা থেকে রাত একটার মধ্যেই, ফাইনালও হয়েছিল রাত নয়টায়। সেটা ছিল ব্যতিক্রম। সাধারণ নিয়মে যা ঘটে, তা অনেক কঠিন টিভির পর্দার সামনে বসে থাকতে থাকতে একটা পুরো মাস কেটে যায় অস্বাভাবিক সময়ে জেগে থেকে।
এই সময়টায় রাস্তায় বের হলে অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখা যায়।
দোকানপাট সব বন্ধ, সাইনবোর্ডের আলোও নেভানো, কিন্তু এক-একটা জানালা থেকে নীলচে আলো বেরিয়ে আসছে, আর সেই আলোর সঙ্গে মিশে আসছে ধারাবিবরণীর গলা। কোনো জানালায় হঠাৎ হাততালি, কোনো জানালায় হতাশার দীর্ঘশ্বাস গোলের ফলাফল বুঝে নেওয়া যায় শুধু এই শব্দ শুনেই, রাস্তায় না নেমেও।
শরীর এই বদল সহজে মানে না। মেলাটোনিন নামের হরমোনটা সূর্য ডোবার পর আস্তে আস্তে বাড়ার কথা, ঘুম আনার জন্য; কিন্তু এই একটা মাস তাকে জোর করে চাপা দিয়ে রাখা হয় স্কোরবোর্ডের আলোর নিচে।
জার্মান ক্রনোবায়োলজিস্ট টিল র্যোনেনবার্গ ২০০৬ সালে এই দশাটার নাম দিয়েছিলেন 'সোশ্যাল জেট-ল্যাগ', আর সংজ্ঞায় লিখেছিলেন এটা হলো 'কাজের দিন আর ছুটির দিনের মধ্যে, সামাজিক ও জৈবিক সময়ের ফারাক'।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-রাতগুলোতে এই ফারাকটা চরমে গিয়ে ঠেকে। প্রথম সপ্তাহে শরীর প্রতিরোধ করে। দ্বিতীয় সপ্তাহে মানিয়ে নেয়। তৃতীয় সপ্তাহে গিয়ে টের পাওয়া যায়, এই মানিয়ে নেওয়াটাই আসলে একরকম ক্ষয় চোখের কোণে, মাথার ভেতরে, কাজের গতিতে।
ক্লান্তি যেখানে আনন্দের ভাষা
তিন সপ্তাহ পর এই ক্ষয়টা চোখে পড়ে। অফিসের মিটিংয়ে কারো চোখ আপনাআপনি বন্ধ হয়ে আসে। রিকশাচালকের হাত স্টিয়ারিংয়ে একটু কেঁপে ওঠে, যেটা সাধারণত হয় না। বাংলাদেশের অফিসগুলো সকাল আটটায় বাঁধা, অথচ রাত তিনটা পর্যন্ত জেগে থাকার পরও সকালে হাজিরা দিতে হয়—এই দুই দাবির মাঝে পড়ে কাজের মান কমে যায়, ধীরে ধীরে, খুব স্পষ্টভাবে না হলেও। তরুণ কর্মী বেশি যে প্রতিষ্ঠানে, সেখানে এই এক মাস উৎপাদনশীলতা একটু পড়ে যাওয়াটা প্রায় রীতিতে দাঁড়িয়ে গেছে। যাদের পরীক্ষা পড়ে যায় এই সময়ে, তাদের পড়ার টেবিল আর টিভির পর্দার মধ্যে একটা নিঃশব্দ লড়াই চলে রাতভর। কেউ কেউ বইয়ের পাশে মোবাইল রেখে দুটোতেই চোখ রাখার চেষ্টা করে, যদিও সকালের পরীক্ষার খাতায় সেই রাতের ফলটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
তবু কেউ এটাকে বিরক্তি বলে মানে না। 'চোখ লাল হয়ে গেছে' কথাটা এই মাসে বলা হয় প্রায় গর্বের সুরে। মোস্তফা মামার দোকানে যে পাঁচজন বেঞ্চিতে গাদাগাদি বসে আছে, তাদের কেউ সকালে রিকশা চালাবে, কেউ বাজারে বসবে, কেউ স্কুলে যাবে ঘুম-ঘুম চোখে। অথচ এই মুহূর্তে তাদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। একা একজনের ঘুম কমে যাওয়া কষ্টের। কিন্তু পুরো পাড়া যখন একসঙ্গে জেগে থাকে, কষ্টটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে যায়—ভাগ করে নেওয়া ক্লান্তি যেন আর ক্লান্তি থাকে না, হয়ে যায় এক রকম সঙ্গ।
যে দেশ নিজের জার্সি পরে না
বাংলাদেশের কোনো দল বিশ্বকাপে খেলে না। তবু রাত জাগার তীব্রতায় এই দেশ অনেক অংশগ্রহণকারী দেশকেও পেছনে ফেলে দেয়। গ্রামের রাস্তায়, রিকশার পেছনের পর্দায়, ধানখেতের পাশের দোকানে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা ঝোলে। সমর্থনটা প্রায়ই বংশ পরম্পরায় চলে আসে—বাবার দলকে ছেলে বেছে নেয় না জেনেই, পাড়ার বড় ভাইয়ের পতাকার রং দেখে ছোট ভাই ঠিক করে নিজের পক্ষ। কোনো কোনো বাড়িতে দাদা-বাবা-ছেলে তিন প্রজন্ম একই সোফায় বসে একই দলের জন্য গলা ফাটায়, যেটা বছরের অন্য কোনো সময়ে একসঙ্গে ঘটে না। নিজের দল নেই বলেই কি এতটা তীব্রতা? হতে পারে। দেশটা নিজের অনুপস্থিতির শূন্যতা পুরোপুরি ভরে দেয় অন্যের জার্সি গায়ে চড়িয়ে।
আর এই তীব্রতার মধ্যেই একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। একই বারান্দায়, একই ছাদে, একই অলিগলিতে দশজন মানুষ যখন একসঙ্গে গোলের জন্য চিৎকার করে ওঠে, তখন বয়সের ভেদ থাকে না, পেশার ভেদ থাকে না। রাত তিনটায় যে রিকশাচালক আর যে দোকানদার পাশাপাশি বসে খেলা দেখছে, দিনের আলোয় তাদের মাঝে যে দূরত্ব থাকার কথা, তা এই কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ মুছে যায়। ঘুম কমে, চোখের নিচে কালি পড়ে। তবু মেসি যেদিন কাপ হাতে তোলেন, সেদিন ভোরের আলোয় রাস্তায় নেমে আসা মানুষের ভিড় বলে দেয়—এই দেশ জার্সি পরে না নিজের নামে, কিন্তু ঘুমটা ঠিকই বিলিয়ে দেয় অন্যের আনন্দে, প্রতিবারই, নতুন করে।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.