ফুটবল বিশ্বকাপে ড্রয়িংরুমকে যেভাবে স্টেডিয়াম বানাবেন

প্রকাশ :
সংশোধিত :

চার বছর পর পর একটা জ্বর আসে। থার্মোমিটারে ধরা পড়ে না। ডাক্তার বোঝেন না। কিন্তু যার এসেছে, তিনি চেনেন। রাত দুইটায় টিভির সামনে বসে গলা ফাটানো, অচেনা দেশের গোলে লাফিয়ে ওঠা, পাশের ফ্ল্যাট থেকে চিৎকার ভেসে আসা। ফুটবল বিশ্বকাপ এলে এই জ্বর ধরে। মাঠে যাওয়া হয় না, স্টেডিয়াম অনেক দূরে। তাই ড্রয়িংরুমটাকেই স্টেডিয়াম বানাতে হয়। এই লেখা তাদের জন্য যারা সেই কাজটা একটু মনোযোগ দিয়ে করতে চান।
রঙ দিয়ে শুরু
ঘর সাজানোর কথা উঠলে অনেকে ভাবেন ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। আসলে না।
রঙই সবচেয়ে বড় কাজ করে। আগে ঠিক করুন কোন দলের পক্ষে আছেন। ব্রাজিলিয়ান হলে হলুদ আর সবুজ, আর্জেন্টিনার দলে থাকলে আকাশি আর সাদা। সেই রঙের কুশন কভার, টেবিল রানার বা ছোট পতাকা লাগালেই ঘরের চেহারা পালটে যায়।
নিউমার্কেট বা যেকোনো কাপড়ের দোকানে সস্তায় পাওয়া যায়। পতাকার কথা আলাদা করে বলা দরকার। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় ঢাকার ছাদে ছাদে পতাকা উঠেছিল। মহল্লায় মহল্লায় রঙিন হয়ে গিয়েছিল গলি। সেই আবেগটাকে ঘরের ভেতরে আনুন।
পর্দার পাশে একটা পতাকা, দেয়ালে টেপ দিয়ে কয়েকটা কাটআউট, জানালায় কাগজের মালা। বাড়তি কিছু না লাগলেও একটা উৎসবের গন্ধ তৈরি হয়।
রঙের ব্যাপারে আরেকটু সাহস দেখাতে পারেন। থিমড টেবিলক্লথ, রঙিন প্লেট বা গ্লাস, এমনকি টিস্যু পেপারও যদি দলের রঙে মেলানো হয়, পুরো বিষয়টা একটা চেহারা পায়। মনে হয় পরিকল্পনা করে করা হয়েছে। মেহমান বুঝতে পারেন কে কোন দলের।
টিভি বসানোর বিজ্ঞান
বিশ্বকাপ দেখার কেন্দ্রে থাকে টিভি ।কিন্তু শুধু টিভি থাকলেই হয় না। কোথায় বসালে ভালো দেখা যাবে, সেটা আগে ঠিক করতে হয়। স্ক্রিনের দূরত্ব হওয়া উচিত স্ক্রিনের উচ্চতার অন্তত তিনগুণ। ৪৩ ইঞ্চি টিভি হলে বসার জায়গা হবে অন্তত পাঁচ ফুট দূরে। তার চেয়ে কাছে বসলে ঘাড় ব্যথা করবে, চোখে চাপ পড়বে, খেলার মাঝেই ঘুম আসবে।
টিভির উচ্চতাও গুরুত্বপূর্ণ। মাটি থেকে স্ক্রিনের মাঝ বরাবর হওয়া উচিত চোখের সমান্তরালে। নিচে থাকলে ঘাড় ঝোঁকাতে হয়, উপরে থাকলে টানটান হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়। বাসায় এই সামান্য সমন্বয়টা কেউ করেন না, কিন্তু দুই ঘণ্টার ম্যাচে পার্থক্যটা বোঝা যায়।
পর্দা টেনে দিন। টিভির পেছনে একটু আলো রাখুন। সরাসরি ঘরের লাইট বন্ধ রেখে টিভি দেখলে চোখে চাপ পড়ে। পর্দা টানা থাকলে আর পেছনে হালকা আলো থাকলে সেই চাপ অনেকটাই কমে। প্রযুক্তির ভাষায় এটাকে 'বায়াস লাইটিং' বলে। কাজটা সহজ, ফলটা চোখে পড়ার মতো।
স্মার্ট টিভি থাকলে স্ট্রিমিং সার্ভিসের 'স্পোর্টস মোড' আছে কিনা দেখুন। এই মোডে মোশন স্মুদনেস বাড়িয়ে দেওয়া হয়, দ্রুতগতির খেলায় ছবি ঝাপসা হয় না। বেশিরভাগ মানুষ এই সেটিং জানেনই না, ব্যবহার করা তো দূরের কথা।
বসার ব্যবস্থা
বিশ্বকাপের রাতে বাসায় পাঁচজন আসলে সোফায় জায়গা হয় না।
আগে থেকে ভাবতে হবে। মেঝেতে বসার জন্য পুরনো কম্বল বা চাদর বিছিয়ে দিন। বালিশ দিয়ে হেলান দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। পেছনের সারিতে একটু উঁচুতে বসার জন্য মোড়া বা ছোট টুল কাজে আসে। ম্যাচের আগেই ঠিক করে নিন কে কোথায় বসবেন। গোলের মুহূর্তে এই আলোচনা করতে গেলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়।
মেঝেতে বসলে পিঠে টান লাগে, এটা সবাই জানেন। দেয়ালের কাছে হেলান দিয়ে বসলে সমস্যা কম। পিঠের পেছনে মুড়িয়ে রাখা কম্বল বা বড় কুশন গুঁজে দিলে দুই ঘণ্টা একটানে থাকা যায়।
জায়গার পরিকল্পনায় একটা বিষয় মাথায় রাখুন। প্রত্যেকের সামনে যেন একটু ফাঁকা জায়গা থাকে। গোল হলে উঠে দাঁড়ানোর জায়গা না থাকলে পুরো আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়। স্টেডিয়ামে মানুষ উঠে দাঁড়ায়। ড্রয়িংরুম স্টেডিয়ামেও সেই জায়গাটা রাখা দরকার।
আলোর খেলা
ঘরের আলো বদলে দেওয়া যায় অল্প খরচে।
বাজারে এলইডি স্ট্রিপ লাইট পাওয়া যায়। তিনশো থেকে পাঁচশো টাকার মধ্যে। রঙ বদলানো যায়, উজ্জ্বলতা কমানো-বাড়ানো যায়। টিভির পেছনে লাগিয়ে দিলেই ঘর বদলে যায়। সবুজ আর হলুদ রাখলে ব্রাজিলের রাত, নীল আর সাদায় আর্জেন্টিনার উৎসব। এই আলো বদলের কাজটা আধঘণ্টার বেশি লাগে না, কিন্তু ঘরে বসলে মনে হয় অন্য কোথাও এসেছেন।
মোমবাতিও একটা অপশন। গন্ধহীন মোমবাতি জ্বালালে ঘরে একটা আলাদা আবহ তৈরি হয়। খেলার উত্তেজনার মধ্যে মোমের কাঁপা আলো অদ্ভুত একটা নাটকীয়তা যোগ করে। হাফটাইমে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সেই আলো একটু অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করে। সিনেমার হলের মতো একটা ব্যাপার।
মূল লাইট বন্ধ রেখে শুধু স্ট্রিপ লাইট আর টিভির আলোয় একবার খেলা দেখুন। মনে হবে অন্য জায়গায় আছেন।
শব্দের আবহ
স্টেডিয়ামে শব্দ আছে। সাপোর্টারদের গর্জন, মাঠের শোরগোল, ধারাভাষ্যকারের উত্তেজিত গলা।
ঘরে সাউন্ড ভালো না হলে সেই অনুভূতি আসে না। টিভির নিজস্ব স্পিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুর্বল। ভিড়ের শব্দ ধরতে পারে না, গোলের পরের গর্জনটা চুপসে যায়। একটা মাঝারি ব্লুটুথ স্পিকার কানেক্ট করে দিন। ভলিউম বাড়ান। সাউন্ডবার কিনতে হবে না, পার্থক্য টের পাবেন।
টিভির অডিও সেটিংসে 'স্পোর্টস' বা 'স্টেডিয়াম' মোড আছে কিনা দেখুন। অনেক টিভিতেই থাকে। এই মোড ভিড়ের শব্দ আর ধারাভাষ্যের ব্যালেন্স আলাদাভাবে সামলায়। পেনাল্টি শুটআউটে ধারাভাষ্যকারের গলা যখন কাঁপে, সেটা ঠিকমতো শুনতে পেলে পুরো অভিজ্ঞতাটা আলাদা হয়ে যায়।
খাবার নিয়ে হিসাব
স্টেডিয়ামে খাবারের স্টল থাকে। ড্রয়িংরুম স্টেডিয়ামে সেটা নিজেকেই সামলাতে হয়।
খাবার আগেই তৈরি রাখুন। ম্যাচ চলাকালীন রান্নাঘরে গেলে গোল মিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ছোট বাটিতে চিপস, বাদাম, চানাচুর। ঠান্ডা পানীয় ফ্রিজে। একটা ছোট টেবিল সোফার পাশে টেনে আনুন। সব নাগালে থাকুক, উঠতে না হোক।
হাফটাইমের জন্য গরম কিছু রাখতে পারেন। পনেরো মিনিট আছে, নুডলস বা ডিম ভাজি করার সময় হয়। হাফটাইমের খাবারটা একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে, যদি আগে থেকে ভেবে রাখেন। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার আগে সবাই খেয়ে সেরে নিতে পারেন।
থিমড খাবারের কথাও ভাবতে পারেন। ব্রাজিলের খেলা হলে কফি বা কোকো। ইউরোপীয় দলের ম্যাচে পিৎজা বা পাস্তা। বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে হয়তো, কিন্তু বন্ধুরা এটা মনে রাখবেন। কোন রাতে কী খেয়েছিলেন সেটা গোলের মতোই স্মৃতিতে থেকে যায়।
জার্সির কথা
একটা কথা বলার আছে।
জার্সি পরুন। ছোট ব্যাপার মনে হয়। কিন্তু জার্সি পরে সোফায় বসলে মাঠের অনুভূতিটা একটু হলেও আসে। সবাই একই দলের জার্সিতে থাকলে ঘরটা আর শুধু ঘর থাকে না। একটা দলীয় ব্যাপার হয়ে ওঠে। গোলের পরে একে অপরের দিকে তাকালে মনে হয় সত্যিই একসঙ্গে মাঠে আছেন।
আর গোল হলে ঝাঁপ দেওয়ার জায়গা রাখুন। সামনে কফির কাপ বা কাচের জিনিস থাকলে বিপদ। ম্যাচের আগেই সরিয়ে রাখুন। উত্তেজনায় হাত লাগলে পড়বে। দেয়ালে যা ঝুলছে সেটাও মজবুত করে রাখুন।
বিশ্বকাপ চার বছরে একবার আসে। পঁচিশ দিন। চৌষট্টিটা ম্যাচ। তারপর আবার চার বছর। এই সময়টা ঘরে বসেও ঠিকঠাকভাবে উদযাপন হতে পারে।
মাঠের ঘাসের গন্ধ আনা যায় না। কিন্তু রাত দুইটায় গোলের পরে যে চিৎকারটা বেরিয়ে আসে, সেটার জন্য স্টেডিয়াম লাগে না। শুধু একটু প্রস্তুতি লাগে। রঙ একটু, আলো একটু, শব্দ একটু আর পাশে কিছু মানুষ।বাকিটা খেলাই করে দেয়।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.