৯০-এর দশকের ঈদ

এক হারিয়ে যাওয়া সোনালী শৈশব

প্রকাশ :

সংশোধিত :

​আজকের ডিজিটাল যুগে ঈদের আনন্দ মানেই হয়তো স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা রঙিন সব গ্রাফিক্স, দামি রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের সাথে বুফে ডিনার কিংবা ব্র্যান্ডের আউটলেটে এসি-র নিচে শপিং। কিন্তু যারা নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে ঈদের সংজ্ঞা ছিল একেবারেই অন্যরকম। সেই সময়ে ঈদ মানে শুধু কেবল উৎসব ছিল না, ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এক টুকরো শুদ্ধ আবেগ আর এক বুক ভালোবাসা।

​চাঁদ রাত: আনন্দের মহড়া

​নব্বই দশকের ঈদ শুরু হতো মূলত 'চাঁদ রাত' থেকে। শাওয়ালের বাঁকা চাঁদ দেখার জন্য পাড়ার সব ছেলেমেয়েরা মিলে ছাদে বা খোলা মাঠে ভিড় জমানোর সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। রেডিও বা বিটিভিতে যখন সেই চিরায়ত গানটি বেজে উঠত— "ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...", তখন মনে হতো আকাশের চাঁদ যেন সরাসরি মনের ভেতরে এসে ধরা দিয়েছে।

​মেয়েদের কাছে চাঁদ রাত মানেই ছিল মেহেদি উৎসব। এখনকার মতো ইনস্ট্যান্ট কোণ মেহেদি বা স্টেনসিল ছিল না। গাছ থেকে মেহেদি পাতা পেড়ে পাটায় বেটে হাতে লাগানো হতো। হাতের তালুতে সেই বড় একটা গোল চাঁদ আর আঙুলের ডগায় টকটকে লাল রঙের মায়া ছিল বর্তমানের মেকি ডিজাইনের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। পরদিন সকালে কার হাত কত বেশি লাল হলো, তা নিয়ে চলত বিশাল প্রতিযোগিতা।

​নতুন জামার সুবাস

​সেই সময়ে নতুন জামা কেনা হতো ঈদের অন্তত পনেরো - পঁচিশ দিন আগে। আর সেই জামা আলমারিতে লুকিয়ে রাখার মধ্যে ছিল এক রোমাঞ্চ। ঈদের নতুন কাপড় কাউকে দেখানো যাবে না, কেউ দেখে ফেললেই ঈদ পুরোনো হয়ে যাবে- এমন এক অদ্ভুত মিষ্টি বিশ্বাস ছিল শিশু-কিশোরদের মনে। ঈদের দিন সকালে গোসল সেরে যখন সেই নতুন জামাটি পরা হতো সেই কাপড় থেকে ভেসে আসতো মাড় আর নতুনত্বের এক অতুলনীয় ঘ্রাণ। ব্র্যান্ডের নাম নয়, বরং দর্জিবাড়ি থেকে বানিয়ে আনা জামার ফিটিং আর পকেটের সংখ্যাই ছিল তখনকার আভিজাত্যের মাপকাঠি।

​সালামি আর পাড়া-বেড়ানোর ধুম

​ঈদের নামাজের পর শুরু হতো আসল মহোৎসব।  বড়দের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে শুরু করতো তুলনামূলক বয়সে ছোটরা আর বিনিময়ে পেতো কড়কড়ে নতুন নোটের সালামি। সেই এক টাকা, দুই টাকা কিংবা পাঁচ টাকার নোটগুলো ছিল সেই সময়ের ছেলেমেয়েদের কাছে অমূল্য সম্পদ। দিনশেষে কার কত টাকা জমা হলো, তা নিয়ে চলত চুলচেরা বিশ্লেষণ।

​তখনকার ঈদ উদযাপনের একটি বড় অংশ ছিল পাড়া-বেড়ানো। কোনো দাওয়াতের তোয়াক্কা না করে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে হানা দেওয়া, আর প্রতিটি ঘরে গিয়ে সেমাই, জর্দা বা ফিরনি চেখে দেখা ছিল অলিখিত নিয়ম। পাড়ার বড় ভাই-বোনদের সাথে দল বেঁধে ঘোরাঘুরি আর তুচ্ছ সব খুনসুঁটিই ছিল ঈদের আসল সার্থকতা।

​বিটিভি ও ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগ

​নব্বই দশকের ঈদ বিনোদন মানেই ছিল বিটিভি। হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’ দেখার জন্য পুরো পরিবার এমনকি পাড়ার সব মানুষ একসঙ্গে টিভি সমৃদ্ধ ড্রয়িংরুমে ভিড় করতো। সেই সময়কার ঈদের নাটকগুলোতে যে সামাজিক শিক্ষা আর পরিচ্ছন্ন হাস্যরস ছিল, তা বর্তমানের নাটকের স্ক্রিপ্টগুলোতে বিরল। এছাড়া ক্যাসেট প্লেয়ারে পছন্দের সব গান বাজিয়ে ঘরকে উৎসবমুখর করে তোলা ছিল তখনকার নিয়মিত অভ্যাস।

​মেলার সেই রঙিন স্মৃতি

​বিকেলের দিকে মা-বাবার হাত ধরে স্থানীয় ঈদ মেলায় যাওয়া ছিল এক বড় পাওয়া। মাটির ব্যাংক, প্লাস্টিকের পিস্তল, বেলুন কিংবা কাঠের খেলনা—সামান্য এসব জিনিসেই যে স্বর্গীয় সুখ পাওয়া যেত, আজকের দামি গ্যাজেটও তা দিতে পারে না। সেই মেলা থেকে কেনা সামান্য হাওয়াই মিঠাইও যেন ছিল অমৃত!

​আজ আমরা অনেক বেশি আধুনিক হয়েছি। আমাদের জীবন এখন অনেক বেশি গতিশীল এবং যান্ত্রিক। কিন্তু হৃদয়ের কোণায় কোথাও এখনো সেই নব্বই দশকের সাদামাটা ঈদগুলো অমলিন হয়ে আছে। সেই সময়ে জৌলুস হয়তো তেমন ছিল না, তবে আন্তরিকতা ছিল ষোলো আনা। প্রযুক্তির অভাব থাকলেও চারদিকে ভালোবাসার কমতি ছিল না। নব্বইয়ের দশকের সেই রঙিন ঈদগুলো আজ কেবলই এক মধুর নস্টালজিয়া, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সুখ আসলে দামি জিনিসে নয়, মিশে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তের সরলতায়।

সর্বশেষ খবর