ঈদে একা থাকা মানুষদের গল্প: নিঃসঙ্গতার ভেতর লুকানো অন্য এক বাস্তবতা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

ঈদের সকাল মানেই সাধারণত আনন্দ, নতুন জামার গন্ধ, কোলাকুলি আর ব্যস্ত রান্না ঘরের শব্দ। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই দেখা যায়—মসজিদ থেকে ফেরা মানুষের ভিড়, শিশুরা নতুন পোশাকে ছুটে বেড়াচ্ছে, আর ঘরে ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি।
কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের আড়ালেই আছে আরেকটা নীরব গল্প—ঈদে একা থাকা মানুষের গল্প।
যাদের ঈদ মানে কোলাহলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা, স্মৃতির ভেতর ডুবে থাকা, কিংবা নতুন করে একা থাকার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।
শহরের ভেতর নিঃশব্দ সকাল
ঢাকায় যারা একা থাকেন—চাকরি, পড়াশোনা বা অন্য কারণে—তাদের অনেকের জন্য ঈদটা হয় একেবারে অন্যরকম। সকালটা শুরু হয় অ্যালার্মে, পরিবারের ডাকে নয়।
রাহাত (ছদ্মনাম), একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঈদের দিনেও তার ছুটি মেলেনি। বাইরে ঈদের নামাজ শেষেমানুষ যখন কোলাকুলিতে ব্যস্ত, তখন তিনি ছোট্ট বাসায় বসে মোবাইলে গ্রামের বাড়ির লাইভ দৃশ্য দেখেন।
ভিডিও কলে মা জিজ্ঞেস করেন, “খেয়েছো?” তিনি হেসে বলেন, “হ্যাঁ, খেয়েছি।”
বাস্তবে তার সামনে তখনো অর্ধেক খাওয়া এক কাপ চা আর দুটো টোস্ট বিস্কিট। এই একাকীত্বটা শুধু শারীরিক না—এটা মানসিকও। চারপাশে উৎসব যত বাড়ে, একা থাকার অনুভূতি টাও ততো তীব্র হয়ে ওঠে।
প্রবাসে ঈদ
দেশের বাইরে যারা কাজ করেন, তাদের ঈদ আরও ভিন্ন।
সেলিম (ছদ্মনাম) মধ্যপ্রাচ্যের একটি কারখানায় কাজ করেন। ঈদের দিনেও তার শিফট আছে। দুপুরে একটু সময় পেলে তিনি ফোন বের করে ফেসবুক স্ক্রল করেন। বন্ধুরা ছবি দিয়েছে—কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে। একটা ছবিতে থেমে যান তিনি। তার ছোট ভাই নতুন পাঞ্জাবি পরে হাসছে। ফোনটা কিছুক্ষণ চুপচাপ হাতে রেখেদেন সেলিম।
তার পাশের সহকর্মী জিজ্ঞেস করে, “আজ তোমাদের উৎসবনা?” সে একটু হাসে—“হ্যাঁ… কিন্তু কাজ তো আছেই।”প্রবাসে ঈদ মানে অনেক সময় দায়িত্ব আর বাস্তবতার কাছে আবেগকে সরিয়ে রাখা।
একাকীত্ব সব সময় নিঃসঙ্গ ঘরে থাকে না। অনেক সময় সেটা থাকে ভিড়ের মাঝেও।
সোহেল (ছদ্মনাম) ঈদের দিন বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান। আড্ডা, হাসি, গল্প—সব কিছুই হয়। তবুও কোনও একটা সময় তিনি চুপ হয়ে যান। কারণ যখন সবাই পরিবারের কথা বলে, তখন তিনি নিজেকে আলাদা মনে করেন।
তার মা-বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। ভাই-বোনও নেই। বন্ধুরা পাশে থাকলেও সেই ‘নিজের মানুষ’ অনুভূতিটা আর ফিরে আসে না। এই একাকীত্বটা সবচেয়ে কঠিন—কারণ এটা দৃশ্যমান না, কিন্তু গভীর।
অন্যরকম ঈদ: একা থেকেও আনন্দ
তবে একা থাকা মানেই সব সময় দুঃখ না। কেউ কেউ এই সময়টাকে নিজের মতো করে উপভোগ করতে শেখেন।
উন্নয়নকর্মী সাফওয়ান (ছদ্মনাম) ব্যক্তিগত কারণে এবারের ঈদে ঢাকায় থাকছেন। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও তারঈদ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি একটু আলাদা।
“একা আছি, ঠিক আছে—কিন্তু একা মানেই খারাপ লাগবে, এটা আমি মনে করি না। ঢাকায় আমার বন্ধু-বান্ধব আছে। ঈদের দিন টিএসসি-তে যাবো, বাইরে খাবো, আড্ডা দেবো। পরিবার নেই পাশে, কিন্তু একটা আলাদা অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে—নিজের মতো করে দিনটা কাটানোর। এই ঈদটা একটু অন্যরকম, কিন্তু খারাপ না।”
সাফওয়ানের মতো অনেকেই এখন একাকীত্বকে নতুনভাবে দেখছেন। তারা এটাকে শুধুই অভাব হিসেবে না দেখে, বরং একটা আলাদা অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করছেন।
ঈদের দিনে একা থাকা মানুষদের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হয়তো ‘সংযোগ’। একটা ফোন কল, একটা মেসেজ, কিংবা হঠাৎ কারও বাসায় দাওয়াত—এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই দিনটা বদলে দিতে পারে।
অনেকেই তাই এখন নিজের মতো করে ঈদ সাজিয়ে নিচ্ছেন। কেউ সিনেমা দেখে, কেউ রান্না করে, কেউ বই পড়ে, কেউ বন্ধুর সঙ্গে বের হয়। একাকীত্ব তখন পুরোপুরি দূর নাহলেও, তা আর আগের মতো ভারী থাকে না।
ঈদ আমাদের শেখায়—আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেতার সৌন্দর্য। কিন্তু এই ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ সবার জন্য সমান না।
তাই হয়তো আমাদের আশেপাশে এমন একা কেউ থাকলে তাকে একটা ফোন দেওয়া, একটা “ঈদ মোবারক” বলা, কিংবা একটু সময় দেওয়া—এই ছোট কাজগুলোই তার জন্য অনেক বড় পাওয়া হয়ে উঠতে পারে। কারণ ঈদের আসল আনন্দ শুধু ভিড়ে না—বরং মানুষে মানুষে সংযোগে।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.