চলতি বছরে পাঠকের ঝুলিতে রাখার মতো ২০টি ফিকশন বই

প্রকাশ :
সংশোধিত :

নানান ঘরানার বইই প্রতিবছর বাজারে আসে। পছন্দের বই কোনটি জানতে চাওয়া হলে অনেকের পছন্দই আগেকার ক্ল্যাসিক। তবে এবছর ভিন্ন বলা যায়ই। কেননা, চলতি বছরের বাজারে এমন কিছু ফিকশন ঘরানার বই এসেছে যেগুলো নিয়ে পাঠক আগামী অনেক বছর নিজেদের পছন্দের তালিকায় আগলে রাখবে। চলতি বছরে এমন ২০ টি ফিকশন বই সম্পর্কে চলুন জেনে নিই।
১. কার্পাসমহল, ওয়াসি আহমেদ
এই উপন্যাসে পাহাড়ি অঞ্চল, মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও বাস্তবতার অদ্ভুত মিশ্রণ ফুটে উঠেছে। তিরুতমা চাকমা নামের এক তরুণীর জীবনযাত্রা, তার অভ্যন্তরীণ জগৎ এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গল্প এগোয়। ভাষা ও পরিবেশ নির্মাণে লেখক এক ধরনের স্বপ্নময় আবহ তৈরি করেছেন।
২. সাপ ও শাপলা, নিকোস কাজানতাকিস (অনুবাদ: খালীকুজ্জামান ইলিয়াস)
খালীকুজ্জামান ইলিয়াস: যার অনূদিত যেকোনো বই নির্দ্বিধায় কেনা যায়। বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ লেখক নিকোস কাজানজাকিসের ডায়েরি স্টাইলে লেখা উপন্যাস এই বই। মানবজীবনের নৈতিক দ্বন্দ্ব, আধ্যাত্মিকতা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। খালীকুজ্জামান ইলিয়াসের অনুবাদে গল্পগুলো নতুন পাঠকের কাছে সহজবোধ্য ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
৩. ডাকনাম ভুলে গেছি, ওবায়েদ হক
এই উপন্যাসে স্মৃতি, শহুরে জীবন, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং মানুষের ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতার নানা দিক উঠে এসেছে। লেখকের ভাষা সংযত কিন্তু গভীর। ছোট ছোট ঘটনা ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্গত অনুভূতিগুলো তুলে ধরেছেন।
৪. নিক্রপলিস, মামুন হুসাইন
নাম থেকেই বোঝা যায়, এই উপন্যাসের ভেতরে আছে অন্ধকার ও রহস্যের আবহ। এক অদ্ভুত শহরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে গল্প, যেখানে অতীত ও বর্তমানের সীমারেখা বারবার ভেঙে যায়। আধুনিক নগরজীবনের সংকট, বিচ্ছিন্নতা ও ভয়ের মনস্তত্ত্ব এই বইয়ের প্রধান শক্তি।
৫. মসলার কৌটা, কিযী তাহনিন
গৃহস্থ জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, রান্নাঘরের স্মৃতি, পারিবারিক সম্পর্ক ও নারীর জীবনের নানা স্তরকে গল্পে রূপ দিয়েছেন লেখক। মসলার কৌটা এখানে শুধু রান্নার উপকরণ নয় বরং এটি স্মৃতি, ইতিহাস ও পারিবারিক উত্তরাধিকারীর প্রতীক হয়ে উঠেছে।
৬. ঠাকুরের নীলগাই, সৈয়দ মুহাম্মাদ আশরাফ (অনুবাদ: মাসুম শাহাদাত)
মাসুম শাহাদাত: গুণী ও দক্ষ অনুবাদক। উর্দু সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য গল্পকার সৈয়দ মুহাম্মাদ আশরাফের গল্পগুলো নিয়ে এই সংকলন। গ্রামীণ সমাজ, ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব গল্পগুলোর মূল বিষয়। অনুবাদে মূল গল্পের ভাব ও আবহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
৭. ফেনাফুল, হেমায়েত উল্লাহ ইমন
কবিতার বই‘ফেনাফুল’ এক জলজ বাসনা। নারী ও শরীরের রূপক, কখনো ভূমি কিংবা দেশ। এখানে প্রেম ঘামে ভেজা, ঋতুচক্রে ক্লান্ত, যৌনতায় দ্বিধাগ্রস্ত। সীমা ভেঙে কবিতাগুলো প্রতিনিয়ত দ্বিধায় ফেলে। 'ফেনাফুল' শেষপর্যন্ত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও সমষ্টিগত ক্ষয়ের চিহ্ন।
৮. অন্য কারও খোঁয়ারি, সুহান রিজওয়ান
মানুষের মানসিক ভাঙন, স্মৃতি ও পরিচয়ের সংকট এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয়। লেখক এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাহিনী নির্মাণ করেছেন, যার কেন্দ্রে রয়েছেন কথসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ফলে প্রতিটি পৃষ্ঠাই পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
৯. স্ট্রেঞ্জ পিকচার্স, উকেতসু (অনুবাদ: আহনাফ তাহমিদ)
এ সময়ের অন্যতম সেরা অনুবাদক আহনাফ তাহমিদ। তার হাতে অনূদিত বিভিন্ন ভাষার বই পাঠকদের তালিকায় থাকে। এবারের বই মেলাতেও আহনাফ তাহমিদের অনূদিত স্ট্রেঞ্জ পিকচার্স ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জাপানি রহস্যধর্মী সাহিত্যের একটি আলোচিত কাজ এই স্ট্রেঞ্জ পিকচার্স। অদ্ভুত কিছু ছবিকে ঘিরে শুরু হয় রহস্যের জাল। ছবির ভেতরের অস্বাভাবিক ইঙ্গিত ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। রহস্য ও মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের মিশ্রণে বইটি পাঠককে টানটান উত্তেজনায় রাখে।
১০. ডিজারশন, আবদুলরাজ্জাক গুরনাহ (ভাষান্তর: আলী আহমদ)
আলী আহমদ: সিরিয়াস বইয়ের অনুবাদে নির্ভরযোগ্য এক নাম। নোবেলজয়ী লেখক গুরনাহর এই উপন্যাসে উপনিবেশবাদ, অভিবাসন এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংকট তুলে ধরা হয়েছে। আফ্রিকার উপকূলীয় সমাজ ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পটভূমিতে নির্মিত গল্পটি মানবসম্পর্কের সূক্ষ্ম দিকগুলোও অনুসন্ধান করে।
১১. জাম্প অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, নাদিন গোর্ডিমার (অনুবাদ: আফসানা বেগম)
আফসানা বেগম: সাবলীল ও প্রাণবন্ত অনুবাদের জন্য সুপরিচিত। নোবেলজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান লেখক নাদিন গোর্ডিমারের গল্পসংকলন। বর্ণবৈষম্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সংঘাত এই গল্পগুলোর কেন্দ্রবিন্দু। অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা পাঠক বিশ্বসাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ লেখকের কাজ নতুনভাবে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
১২. দ্য হন্টিং অব হিল হাউজ, শার্লি জ্যাকশন (অনুবাদ: লুৎফুল কায়সার)
লুৎফুল কায়সার: এ সময়ের ব্যস্ততম ও ভার্সেটাইল অনুবাদক। দুই বাংলায় জনপ্রিয়। গথিক হরর সাহিত্যের অন্যতম ক্লাসিক। এক রহস্যময় প্রাসাদে কয়েকজন মানুষের অবস্থান এবং সেখানে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনাকে ঘিরে কাহিনীটি তৈরি। ভয়ের আবহ তৈরি করার ক্ষেত্রে শার্লি জ্যাকসনের দক্ষতা এই বইকে দীর্ঘদিন ধরে পাঠকদের প্রিয় করে রেখেছে।
১৩. নো লংগার হিউম্যান, ওসামু দাজাই (অনুবাদ: কাবিদ হাসান শিবলী)
এ সময়ের জনপ্রিয় ও সাবলীল একজন অনুবাদক। মূল জাপানিজ থেকে অনুবাদ করেছেন এই বইটি। জাপানি সাহিত্যের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা এক মানুষের আত্মস্বীকারোক্তিমূলক জীবনকাহিনি এখানে উঠে এসেছে। অস্তিত্বের সংকট ও নিঃসঙ্গতার তীব্র অনুভূতি বইটির প্রধান শক্তি।
১৪. শাড়ি বাড়ি গাড়ি, আবু রুশদ
সমকালীন শহুরে সমাজের জীবনধারা ও মধ্যবিত্ত মানুষের স্বপ্ন-বাস্তবতার দ্বন্দ্ব এই উপন্যাসের মূল বিষয়। নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভোগবাদী সমাজের প্রতীকী ইঙ্গিত। গল্পে দেখা যায় মানুষের সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের জটিলতা।
১৫. মেরুন সন্ধ্যা, ইমরান কায়েস
নস্টালজিয়া, স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাস। সন্ধ্যার ম্লান আলোয় অতীতের নানা ঘটনার স্মৃতি ফিরে আসে চরিত্রদের জীবনে। ধীরলয়ের বর্ণনায় লেখক এক ধরনের বিষণ্ন সৌন্দর্য তৈরি করেছেন।
১৬. ক্রিওল সুন্দরী, মরিস কোঁদে (অনুবাদ: রওশন জামিল)
রওশন জামিল: তার অনুবাদ এত সাবলীল যে, পড়লে অনুবাদ মনে হয়না। ক্যারিবীয় সমাজ ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে পরিচয়, সংস্কৃতি ও নারীর জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ক্রিওল সংস্কৃতির জটিলতা এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রভাব গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৭. কোলাহলে, এনামুল রেজা
সমকালীন নগরজীবনের ব্যস্ততা ও বিচ্ছিন্নতা নিয়ে লেখা উপন্যাস। মানুষের চারপাশে যত কোলাহলই থাকুক, ব্যক্তিগত জীবনে যে নিঃসঙ্গতা কাজ করে—এই বই সেই অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দিয়েছে।
১৮. নৈশ উৎসবে দুই পলাতক, রায়হান রাইন
রাত্রির শহর, পালিয়ে থাকা দুই চরিত্র এবং তাদের অদ্ভুত যাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে এই উপন্যাস। রহস্য, রোমাঞ্চ ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন গল্পটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
১৯. এক রক্তিম সরোবর, রিদওয়ান উল মাহমুদ
রহস্য ও প্রতীকধর্মী আখ্যানের মিশ্রণে লেখা এই উপন্যাসে একটি অদ্ভুত সরোবরকে কেন্দ্র করে গল্প এগোয়। প্রকৃতি, স্মৃতি ও মানুষের অন্ধকার প্রবৃত্তি গল্পের ভেতরে এক ধরনের গা ছমছমে আবহ তৈরি করে।
২০. যদিও সে দুপুরে ডাকেনাই কোকিল, বায়েজিদ বোস্তামী
কবিতাময় শিরোনামের মতোই উপন্যাসটিও আবেগময়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, হারিয়ে যাওয়া সময় এবং মানুষের অন্তর্গত অনুভূতিকে কেন্দ্র করে গল্পটি গড়ে উঠেছে। ভাষা ও বর্ণনায় আছে কাব্যিকতা।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.