চিরতরুণ, চিরবিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বাংলা কবিতায় কিছু নাম আছে, যাদের বয়স সময়ের সঙ্গে বাড়ে না। প্রজন্ম বদলায়, সমাজ বদলায়, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায় তবু তারা একইরকম প্রাসঙ্গিক থেকে যান। সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই বিরল নামগুলোর একটি। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি বাংলা ভাষার এক অদম্য তরুণ কণ্ঠ, যিনি ক্ষুধা, বঞ্চনা, অসমতা আর বিপ্লবকে কবিতার ভাষায় এমনভাবে প্রকাশ করেছিলেন, যা আজও তরুণদের হৃদয়ে আগুন জ্বালায়।
মাত্র একুশ বছরের জীবনে সুকান্ত যে কবিতার জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, তা বিস্ময়কর। তাঁর কবিতা পড়লে মনে হয়, তিনি যেন বয়সের চেয়ে অনেক বেশি সময় বেঁচেছিলেন। কারণ তাঁর চোখে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী, দুর্ভিক্ষে কাতর মানুষ, শ্রমিকের ঘাম, পথশিশুর ক্ষুধা এবং এক অন্যরকম ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
সুকান্ত এমন সময়ে লিখছিলেন, যখন পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় কাঁপছে। বাংলার মানুষ ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে অনাহারে মরছে। শহরের রাস্তায় পড়ে আছে মৃতদেহ। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শোষণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর শ্রেণিবৈষম্যে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে অসহনীয়। এই বাস্তবতা একজন তরুণ কবিকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তাঁর কবিতায় প্রেমের চেয়ে বেশি এসেছে ক্ষুধা, ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বেশি এসেছে মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
'হে মহাজীবন' কবিতায় তাঁর লেখা “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/ পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”—বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত লাইনগুলোর একটি।
এই একটি লাইনেই যেন সুকান্তের কবিসত্তার সারাংশ ধরা পড়ে। পৃথিবী যখন ক্ষুধায় আক্রান্ত, তখন কাব্যিক সৌন্দর্য অর্থহীন হয়ে যায়। রোমান্টিকতা সেখানে টিকে থাকতে পারে না।
এই নির্মম বাস্তবতাকে সুকান্ত এড়িয়ে যাননি। বরং তিনি কবিতাকে মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সরাসরি কথা বলার ক্ষমতা। তিনি দুর্বোধ্য নন, অলংকারে ভারী নন। তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু তীব্র। মনে হয়, যেন একজন তরুণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের পক্ষ থেকে কথা বলছে। তাই আজকের তরুণদের কাছেও তিনি প্রাসঙ্গিক। কারণ আজও পৃথিবী পুরোপুরি বদলায়নি। আজও বেকারত্ব আছে, বৈষম্য আছে, হতাশা আছে, যুদ্ধ আছে, স্বপ্নভঙ্গ আছে।
বর্তমান সময়ের অনেক তরুণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। কেউ চাকরি নিয়ে হতাশ, কেউ সমাজের চাপে ক্লান্ত, কেউ রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষুব্ধ। অনেকেরই মনে হয়—তাদের কণ্ঠ কেউ শুনছে না। সুকান্তের কবিতা ঠিক এই জায়গায় এসে নতুন অর্থ তৈরি করে। কারণ তিনি হতাশাকে অস্বীকার করেননি, আবার হতাশার কাছে আত্মসমর্পণও করেননি। তাঁর কবিতায় ক্ষোভ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভ মানুষকে জাগিয়ে তুলতে চায়।
এই কারণেই সুকান্ত 'চিরতরুণ'। তিনি শুধু একটি সময়ের কবি নন; তিনি প্রতিটি প্রজন্মের অস্থির তরুণদের কবি। তাঁর কবিতায় যে বিদ্রোহ, তা শুধু রাজনৈতিক বিদ্রোহ নয়, মানসিক বিদ্রোহও। তিনি মানুষকে নিষ্ক্রিয়তা থেকে বের করে আনতে চেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে বারবার শোনা যায় পরিবর্তনের ডাক।
সুকান্তের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি বিপ্লবকে রোমান্টিক কোনো কল্পনা হিসেবে দেখেননি। তাঁর বিপ্লব ছিল মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া, শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—এই ছিল তাঁর স্বপ্ন। তাই তাঁর কবিতার বিপ্লব আজও মানবিক।
'ছাড়পত্র' কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—“এ পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
এই লাইন শুধু কবিতার সৌন্দর্য নয়, এটি এক তরুণ কবির দায়বদ্ধতা। পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার এই স্বপ্নই তাঁকে চিরবিপ্লবী করে তোলে। তিনি জানতেন, পৃথিবী নিখুঁত নয়। তবু তিনি বিশ্বাস হারাননি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সুকান্ত নিজে খুব দীর্ঘ জীবন পাননি। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি এমন এক সাহিত্যিক শক্তিতে পরিণত হন, যা বাংলা কবিতাকে নতুন ভাষা দেয়। তাঁর কবিতায় মধ্যবিত্তের নিরাপদ অনুভূতির চেয়ে বেশি এসেছে রাস্তাঘাটের বাস্তবতা। তাই তাঁর কবিতা বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না; মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে।
আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে তরুণদের অনেকেই নিঃসঙ্গতা, উদ্বেগ আর হতাশার সঙ্গে লড়ছে, সেখানে সুকান্তকে নতুনভাবে পড়া জরুরি। কারণ তিনি শেখান—কষ্টকে শুধু ব্যক্তিগত বেদনা হিসেবে দেখলে হবে না; তাকে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। তিনি শেখান, রাগকে ধ্বংসে নয়, পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত করতে হয়। তাই 'আঠারো বছর বয়স' কবিতায় লিখেছিলেন—'এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।''
বাংলা কবিতায় অনেক কবি এসেছেন, যারা সৌন্দর্যের কথা বলেছেন, প্রেমের কথা বলেছেন, প্রকৃতির কথা বলেছেন। সুকান্তও সৌন্দর্য দেখেছিলেন, কিন্তু তিনি সবচেয়ে বেশি দেখেছিলেন মানুষের ক্ষুধার মুখ। সেই কারণেই তাঁর কবিতা আজও অস্বস্তিকর, আজও তীব্র, আজও প্রয়োজনীয়।
সময়ের সঙ্গে অনেক কবির ভাষা পুরোনো হয়ে যায়। কিন্তু সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও নতুন। কারণ পৃথিবীতে যতদিন বৈষম্য থাকবে, যতদিন তরুণরা স্বপ্ন আর বাস্তবতার সংঘাতে ক্লান্ত হবে, যতদিন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাইবে—ততদিন সুকান্ত বেঁচে থাকবেন। চিরতরুণ হয়ে, চিরবিপ্লবী হয়ে।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.