বৈসাবি উৎসবের নাম যেভাবে এলো 

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি ছবি : দিগন্ত ত্রিপুরা

প্রকাশ :

সংশোধিত :

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে যখন চৈত্রের রোদ নরম হয়ে আসে, যখন পাহাড়ি ঝরনা যেন নতুন সুরে গুনগুন করতে শুরু করে, তখনই আসন্ন এক উৎসবের গন্ধ ভেসে ওঠে বাতাসে বৈসাবি। নামটি শুনলেই যেন রঙ, জল, ফুল আর মানুষের মিলনের এক অপূর্ব চিত্র ভেসে ওঠে। কিন্তু এই ‘বৈসাবি' নামটি এলো কোথা থেকে? এর পেছনে আছে ভাষা, সংস্কৃতি আর সহাবস্থানের এক চমৎকার গল্প।

'বৈসাবি' আসলে কোনও একক জনগোষ্ঠীর উৎসবের নাম নয়। এটি একটি সম্মিলিত শব্দ, যা গঠিত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি প্রধান নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব নববর্ষ উৎসবের নাম থেকে। এই তিনটি জনগোষ্ঠী হলো চাকমা, মারমা এবং ত্রিপুরা।

প্রত্যেকেরই আলাদা সংস্কৃতি, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু বছরের এই বিশেষ সময়ে তারা এক অদ্ভুত মিলনে আবদ্ধ হয়। আর সেই মিলন থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘বৈসাবি' নামটি।

চাকমাদের নববর্ষ উৎসবের নাম ‘বিজু'। এই ‘বিজু' আবার তিন দিনব্যাপী ফুল বিজু, মূল বিজু এবং গোজ্যাপোজ্যা দিন। ফুল বিজুর দিনে পাহাড়ে পাহাড়ে নানা রঙের ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজানো হয়। মূল বিজুতে চলে রান্না-বান্না, বিশেষ করে পচন নামে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হয়। আর শেষ দিনে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, আশীর্বাদ নেওয়া সব মিলিয়ে এক উষ্ণ সামাজিক বন্ধনের আবহ তৈরি হয়

অন্যদিকে মারমাদের নববর্ষ উৎসবের নাম ‘সাংগ্রাই'। এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো জলখেলা। একে অনেক সময় ‘ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল' ও বলা হয়। তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে।

এই পানির মধ্য দিয়ে যেন পুরনো দুঃখ-কষ্ট ধুয়ে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। সাংগ্রাই উৎসবের সময় মারমা সমাজে নাচ, গান, শোভাযাত্রা সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

ত্রিপুরাদের নববর্ষ উৎসবের নাম ‘বৈসু'। বৈসুতেও প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নানা আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, নতুন পোশাক পরা, দেবতার উদ্দেশে প্রার্থনা করা সবকিছুতেই থাকে এক ধরনের পবিত্রতার অনুভূতি। বৈসু শুধু নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব নয়, এটি এক ধরনের আত্মশুদ্ধিরও সময়।

এই তিনটি উৎসব বিজু, সাংগ্রাই এবং বৈসু যখন একই সময়ে, প্রায় একই আবহে পালিত হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে একটি সম্মিলিত পরিচয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, বুঝতে পারে যে তাদের এই মিলিত সংস্কৃতিকে একটি সাধারণ নামে ডাকা গেলে তা আরও শক্তিশালী হবে। সেই ভাবনা থেকেই ‘বৈসাবি' নামের জন্ম।

'বৈসাবি' শব্দটি তৈরি হয়েছে ‘বিজু', ‘সাংগ্রাই' এবং ‘বৈসু' এই তিনটি নামের প্রথম অংশ নিয়ে। ‘বৈ' এসেছে বৈসু থেকে, ‘সা' এসেছে সাংগ্রাই থেকে, আর ‘বি' এসেছে বিজু থেকে। নামটির মধ্যেই তাই লুকিয়ে আছে তিনটি ভিন্ন সংস্কৃতির একত্রীকরণের প্রতীক।

বর্তমানে বৈসাবি শুধু পাহাড়েই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই উৎসবের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বৈসাবি এখন এক পরিচিত নাম। অনেক জায়গায় প্রতীকীভাবে এই উৎসব উদযাপনও করা হয়। তবে এর মূল আত্মা এখনও পাহাড়েই সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়।

তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে ওঠে, পুরুষরা অংশ নেয় নাচ-গানে, শিশুরা মেতে ওঠে খেলাধুলায়। কোথাও ফুলের সাজ, কোথাও পানির ছিটা, কোথাও আবার সুরের মূর্ছনা—সব মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক আনন্দের জগৎ তৈরি হয়।

এই উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো প্রকৃতিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখে। তাই তাদের নববর্ষ উৎসবেও প্রকৃতির উপস্থিতি স্পষ্ট। ফুল, জল, গাছপালা—সবকিছুই যেন এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

mahmudnewaz939@gmail.com

সর্বশেষ খবর