বংশ পরম্পরায় ৬ষ্ঠ প্রজন্ম: যেভাবে দেশে-বিদেশে পৌঁছালো হাজারী গুড়

প্রকাশ :
সংশোধিত :

“আমরা শুধু গুড় তৈরিই করি না। আমরা একটা ইতিহাস টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি।”
কথাগুলো বলছিলেন মো. সানোয়ার হোসেন রাহাত যিনি একজন হাজারী গুড়ের কারিগর যে গুড়ের ইতিহাস ২০০ বছর পুরনো। মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী হলেও শুধু শীতকালে ঐতিহ্যবাহী হাজারী গুড় তৈরির কাজে ফিরে আসেন নিজের শেকড়ে। রাহাত জানান, প্রতিবছর নভেম্বরে শুরু হয়ে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৫টি গাছি পরিবারের প্রায় ৯০ জন নারী-পুরুষ, এমনকি বৃদ্ধরা মিলে হাজারী গুড় তৈরি করেন।
দিনে গড়ে উৎপাদন হয় প্রায় ১২০ কেজি। পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি এর দাম থাকে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা। অনেক সময় এর দাম আরও বেশি হয়ে থাকে। এই গুড় ঝিটকার সীমা ছাড়িয়ে চলে গেছে দেশের নানা অঞ্চলে। ভারত, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশের ক্রেতাদের কাছেও এর চাহিদা দেখা যায়।
রাহাত বলেন, “আমাদের গুড়ের দাম বেশি, এটা সবাই জানে। কিন্তু এই দামের পেছনে আছে কঠোর পরিশ্রম, আছে নিয়ম আর শত বছরের ঐতিহ্য।” হাজারী গুড় তৈরির নেপথ্যের গল্পটি কেমন? কেন এটি এতো জনপ্রিয়? কারা এখনও ধরে রেখেছে এর হাল? কীভাবে তৈরি হয় এই গুড়- এনিয়েই হাজারী গুড় ও এর কারিগরদের গল্প।
হাজারী গুড়- একটি নামেই যেন পরিচিত হয়ে গেছে মানিকগঞ্জ জেলা। সত্যি বলতে, মানিকগঞ্জের সরকারি প্রচারণা স্লোগানেও স্থান করে নিয়েছে এই গুড়। বলা হয়ে থাকে ‘লোকসংগীত আর হাজারী গুড়, মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর।’
লোকগল্প ও ইতিহাসে হাজারী গুড়
প্রায় দুই শতাধিক বছরের পুরোনো এই গুড় শুধু স্বাদের জন্য নয়, ইতিহাস, লোককথা ও পারিবারিক উত্তরাধিকারের কারণেও আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
কীভাবে হাজারী গুড়ের শুরু, এনিয়ে লোকমুখে এক রহস্যময় কাহিনী প্রচলিত আছে। কেউ বলেন জয়নাল হাজারী, আবার কেউ বলেন মোহাম্মদ হাজারী নামে এক গাছি প্রথম এই গুড়টি তৈরি করেন। তবে লোকমুখে যা বেশ প্রচলিত, তা হল—একদিন এক গাছি, খেজুরের গাছে হাঁড়ি পেতে রস সংগ্রহ করছিলেন। তখনই এক দরবেশ এসে তার কাছে এই রস পান করতে চান। সদ্য হাঁড়ি পাতা হয়েছে—এই যুক্তিতে প্রথমে গাছি রস দিতে রাজি হননি। কিন্তু দরবেশের অনুরোধে আবারও গাছে উঠে হাঁড়ি নামালে তিনি দেখেন এটি অর্ধেক রসে পূর্ণ। সেই রসভর্তি হাঁড়ি থেকে খেতে দেয়া হয় দরবেশকে। দরবেশ তখন আশীর্বাদ করে বলেন, “তোর গুড়ের সুনাম একদিন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।”
এই গল্পটি বিভিন্ন সংবাদ উৎসে পাওয়া যায় তবে, অনেকে মনে করেন ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথও এই গুড়ের স্বাদে মুগ্ধ হন এবং নাম রাখেন ‘হাজারী গুড়।' যেখানে ‘হাজার’ শব্দের অর্থ ‘হাজার টুকরো’ বা ‘অসংখ্য’ এর সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। সময় বদলেছে, কিন্তু ঐতিহ্য বদলায়নি। আজও ঝিটকার এই গুড় তৈরি করে যাচ্ছেন পঞ্চম-ষষ্ঠ প্রজন্মের গাছি পরিবারগুলো।
যেভাবে তৈরি হয়
এখনও এই গুড় হাতে তৈরি করা হয়ে থাকে। প্রতি সাতদিন পরপর খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করা হয়। রস সংগ্রহের আগে হাঁড়ি, নালা ও গাছের অংশগুলো গরম পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়। এরপর সেই রস ধীরে ধীরে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়।
এই পদ্ধতি অন্যান্য সাধারণ গুড়ের প্রক্রিয়ার থেকেও বেশি সময়সাপেক্ষ। সাধারণ পাটালি গুড় তুলনায় হাজারী গুড় তৈরিতে বেশি রস লাগে। প্রতি কেজি গুড়ের জন্য প্রায় ৭-৮ কেজি খেজুরের রস প্রয়োজন হয়। রস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে। অতঃপর মাটির হাঁড়িতে ঢালা হয়, নিয়মিত নেড়ে টুকরায় পরিণত করে সাদা রঙের মিষ্টি তৈরি হয়।
দেখতে একেবারে সাদা, স্বাদে মোলায়েম আর গন্ধে অনন্য—এই তিন বৈশিষ্ট্যেই হাজারী গুড় সহজেই আলাদা করে চেনা যায়। সাধারণ গুড়ের তুলনায় এই গুড়ের গুণমান, পুষ্টিগুণ ও স্বাদ এর দামকে তুলনামূলকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
প্রচলিত পাটালি গুড় যেখানে ৪০০-৮০০ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে হাজারী গুড়ের দাম প্রায় ১৬০০-১৮০০ টাকার মধ্যে থাকে এবং অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তা আরও বেশি দরে বিক্রি হয়।
যেভাবে শুদ্ধতা রক্ষা করা হয়
এই গুড়ের স্বকীয়তা ধরে রাখার জন্য পিতলের সিলমোহর ব্যবহার করা হয়। বংশগতভাবে এই গুড়ের মান ও পরিচয় নিশ্চিত করতে হাজারী পরিবার এই বিশেষ সিলমোহরটি ব্যবহার করে থাকেন।
বর্তমান সংকট
তবে এই শতবর্ষী ঐতিহ্যটি সামনে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। কারিগর জনাব রাহাত জানান, একসময় হাজারী গুড়কে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নানা প্রশাসনিক ও সংগঠনিক কারণে সেটি আর সামনে অগ্রসর হয়নি।
এছাড়া, খেজুর গাছের সংখ্যা কমে আসা এবং দক্ষ গাছি বা রস সংগ্রাহক কমে যাওয়াও অন্যতম বড় কারণ। অনেক পরিবার এখন এই কঠোর শ্রমসাধ্য পেশা ছেড়ে অন্যান্য পেশায় মন দিয়েছেন। ফলে, রস পাওয়া কমে এসেছে, যা উৎপাদনকে অনেকটাই সীমিত করেছে।
রাহাত বলেন, “আগে মানুষ খেজুর গাছের পেছনে জীবন কাটাত (জীবিকা নির্বাহ অর্থে।) এখন নতুন প্রজন্ম, তরুণেরা দেশে বা বিদেশে চাকরির সুযোগে পেশা বদলে ফেলছে।”
হাজারী পরিবার মনে করেন, প্রাণবন্ত এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে, খাদ্যসংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি উদ্যোগ ও স্থানীয় সংগঠনের সমর্থন প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ লাগানো, এর বৃদ্ধি, নতুন প্রজন্মকে গাছি হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং বাণিজ্যিক রূপ দেয়ার মতো কর্মসূচি থাকলে এই ঐতিহ্য আরও বহু বছর টিকে থাকতে পারবে। কারণ, হাজারী গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
sadmanshawon121@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.