
প্রকাশ :
সংশোধিত :

প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে, কিন্তু মাঝেমধ্যে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে যা পুরো পৃথিবীর ভারসাম্যকে পরিবর্তন করে দেয়। এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলো 'এল নিনো।' এটি মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিশেষ জলবায়ুগত অবস্থা, যা কয়েক বছর পরপর বিশ্বের আবহাওয়া মণ্ডলকে ওলটপালট করে দেয়।
এল নিনো কী এবং কেন হয়?
স্প্যানিশ শব্দ ‘এল নিনো’র অর্থ ‘ছোট বালক’ বা ‘খোকামণি।’ দক্ষিণ আমেরিকার পেরু ও ইকুয়েডর উপকূলে জেলেরা সাধারণত বড়দিনের সময় সমুদ্রের পানির এই অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন লক্ষ্য করতেন বলে তারা যিশু খ্রিস্টের স্মরণে এই নাম দিয়েছিলেন।
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের শক্তিশালী ‘আয়ন বায়ু’ পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে উষ্ণ পানিকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে এশিয়ার দিকে জমে থাকা উষ্ণ পানি পুনরায় উল্টো পথে আমেরিকার উপকূলের দিকে ফিরে আসে। এই বিশাল পরিমাণ উষ্ণ পানি সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৩ ডিগ্রি হয়ে যায়। সমুদ্রের এই বাড়তি তাপ যখন বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বেড়ে আবহাওয়া চরম হতে থাকে।
এল নিনোর প্রভাবে কি প্রানীরা বেঁচে থাকতে পারবে?
এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের পুষ্টিচক্র বা ‘আপওয়েলিং’ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গোড়ায় থাকা ফাইটোপ্লাঙ্কটন হ্রাস পায়। খাদ্য সংকটে পড়ে মারা যায় কোটি কোটি ছোট মাছ, সিল, সি-লায়ন এবং পেঙ্গুইন।
এছাড়া সমুদ্রের পানি উষ্ণ হওয়ার কারণে 'কোরাল ব্লিচিং' বা প্রবাল প্রাচীরের মৃত্যু ঘটে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য এক বিশাল হুমকি। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট তীব্র খরা ও দাবানলে ক্যাঙ্গারু ও কোয়ালার মতো বন্যপ্রাণীরা তাদের আবাসস্থল হারায়।
বাংলাদেশে এল নিনোর কেমন প্রভাব পড়তে পারে
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এল নিনোর প্রভাব এখানে বেশ উদ্বেগের। এল নিনোর বছরে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত অনেক কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদী খরা দেখা দেয়, যা আমন ও আউশ ধানের চাষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শীতকালে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকে এবং গ্রীষ্মকালে দেখা দেয় দীর্ঘমেয়াদী ও তীব্র 'হিটওয়েভ' বা তাপপ্রবাহ। এটি কেবল কৃষিতে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে কারা
এল নিনোর প্রভাবে মানবদেহে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, পানিবাহিত রোগ (যেমন: ডায়রিয়া, কলেরা) এবং ধূলিকণার কারণে শ্বাসকষ্ট।
এই সময়ে মূলত শিশু (৫ বছরের কম), বয়স্ক ব্যক্তি (৬৫ বছরের বেশি) এবং দিনমজুর বা খোলা আকাশের নিচে কর্মরত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। প্রতিদিন সরাসরি সূর্যালোকে থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করলে যেকোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকে। কাজেই, যারা দিন মজুর, যেমন রিকশাচালক, ইটের ভাটায় কর্মরত শ্রমিক তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
শিশুদের শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যায় এবং প্রবীণদের দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো তীব্র গরমে আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে।
কীভাবে নিজেদের সুস্থ রাখা যায়?
তৃষ্ণা না পেলেও সারাদিন প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ডাবের পানি বা বাড়িতে তৈরি খাবার স্যালাইন শরীরের খনিজ লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বাইরে বের হলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরুন। সিন্থেটিক বা গাঢ় রঙের কাপড় তাপ শোষণ করে শরীরকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। এগুলো এড়িয়ে চলা ভালো।
দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত যখন রোদের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন বাইরে কাজ করা এড়িয়ে চলুন। বের হতে হলে অবশ্যই ছাতা, টুপি বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন।
তেল-চর্বিযুক্ত এবং মশলাদার খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। সহজে হজম হয় এমন তরল বা নরম খাবার এবং রসালো ফল খাদ্যতালিকায় রাখুন। ক্যাফেইন বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় ডিহাইড্রেশন বাড়াতে পারে, তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
বারবার শরীর ভেজা গামছা দিয়ে মোছা বা দিনে দুবার গোসল করা শরীরকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন এবং সম্ভব হলে জানালার পর্দা টেনে ঘর ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করুন।
যদি কারো খুব বেশি মাথা ব্যথা, বমি ভাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়, তবে দেরি না করে তাকে দ্রুত ঠাণ্ডা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.