বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব কমাতে পারেন যেসব উপায়ে

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বাবার ঘরের দরজাটা সন্ধ্যার পর বন্ধ থাকে। ছেলেটার ঘরেরও একই অবস্থা। মাঝখানে একটা করিডোর — কয়েক ফুটের বেশি না। কিন্তু কথাগুলো ওই করিডোর পার হয় না। বুকের মধ্যে আটকে থাকে, বা গলার কাছে।
এই ছবি বাংলাদেশের অনেক ঘরে চেনা। বাবা মানে যেন বিচারক, কিশোর সন্তান মানে যেন আসামি যে রায়ের অপেক্ষায় বসে আছে। এমনটা হওয়ার কথা ছিল না, তবু বহু পরিবারে এটাই বাস্তবতা। প্রশ্নটা থেকেই যায় — এই দূরত্ব কি আদৌ ভাঙা যায়?
ভয়টা যেখান থেকে শুরু
কিশোর বয়সে বাবার সঙ্গে কথা বলতে না পারার পেছনে একটা প্যাটার্ন কাজ করে, যার শুরু আরও আগে থেকে। অনেক বাবা সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন শাসনের ভাষায় — কথা শুরু হয় নির্দেশে, শেষ হয় সতর্কতায়, মাঝখানে আবেগের জায়গা থাকে না বললেই চলে। সন্তান তখন একটা জিনিস ধীরে ধীরে শিখে নেয় — বাবার সামনে কথা বলা মানে নিজেকে রক্ষা করা, প্রকাশ করা নয়।
মাইন্ডসেবার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তাহমিনা সরকার প্রকৃতি বিষয়টাকে দেখেন আরেকটু ব্যবহারিক চোখে। 'বাচ্চারা যখন ছোট থেকে দেখে বাবার কাছে গেলে ভুল ধরা পড়বে, বকা শুনতে হবে — একটা সময় পর তারা নিজেই সরে থাকে। আমরা এটাকে বলি অবাধ্যতা, আসলে এটা একটা রক্ষাকবচ মাত্র।' একটু থেমে যোগ করেন, 'বাবারা কখনো কখনো আমার কাছে এসে প্রথম যে অভিযোগ করেন তা হলো, ছেলে কথা বলে না বা মেয়ে দূরে দূরে থাকে। আমি তখন উল্টো প্রশ্ন করি — দূরত্বটা কবে থেকে শুরু হয়েছিল, মনে করতে পারেন কি? উত্তর সাধারণত পাওয়া যায় না। কারণ এটা একদিনে তৈরি হয়নি।'
এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে গবেষণার তথ্যও মিলে যায়। ওরেগন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক লিসা শিবার এবং তার সহকর্মীরা ২০০৭ সালে জার্নাল অব অ্যাবনরমাল সাইকোলজি-তে একটা গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে বিষণ্ণতাগ্রস্ত ৮২ জন কিশোর-কিশোরীসহ তিনটি গ্রুপের পরিবার পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, বাবার সমর্থনের ঘাটতি এবং বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্ব — এই দুই কারণ মিলে কিশোর বিষণ্ণতার ঝুঁকির একটা বড় অংশ ব্যাখ্যা করে, এবং এই প্রভাব প্রায়ই মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়েও বেশি শক্তিশালী দেখা যায়। অর্থাৎ পরিবারে যতটা মনোযোগ মা-সন্তান সম্পর্কে দেওয়া হয়, বাবা-সন্তান সম্পর্কের ফাটল সেই তুলনায় অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে যায়।
অক্সফোর্ডের গবেষক এইরিনি ফ্লুরি ও অ্যান বুকানন ২০০৩ সালে জার্নাল অব অ্যাডোলেসেন্স-এ একটা দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে হাজারো শিশুকে বছরের পর বছর অনুসরণ করা হয়েছিল। তাদের ফল বলছে — সাত বছর বয়সে বাবার সম্পৃক্ততা শিশুকে মানসিক সমস্যা থেকে রক্ষা করে, আর ষোলো বছর বয়সে বাবার সম্পৃক্ততা মেয়েদের পরে গিয়ে মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচায়। আর এই প্রভাব মায়ের সম্পৃক্ততা থেকে পুরোপুরি আলাদা। মানে বাবা দূরে থাকলে মা যতই কাছে থাকুন, একটা ফাঁক থেকেই যায়, যা পরে ভরাট করা কঠিন।
সেতুটা কেন এত জরুরি
অনেকে ভাবেন কিশোর বয়স পার হয়ে গেলে দূরত্ব নিজে থেকেই কমে আসবে। বাস্তবে হয় ঠিক উল্টোটা। কিশোর বয়সে যে ধরনের যোগাযোগ গড়ে ওঠে, সেটাই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে টিকে থাকে — শুধু চেহারাটা বদলায়। ছেলে বড় হয়ে বাবাকে ফোন করে, দু-মিনিটে কথা সারে — 'ভালো আছি, কাজ চলছে।' মেয়ে বিয়ের পর মাকে নিয়মিত ফোন করে, বাবাকে না। এই অভ্যাসের শিকড় কিশোর বয়সেই পোঁতা হয়।
সেতু তৈরির বাস্তব রাস্তা
কথা বলার পরিবেশ বদলানোটাই প্রথম কাজ। গাড়িতে পাশাপাশি বসে, হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা কোনো কাজ একসঙ্গে করার সময় কথা বলা সহজ হয় — মুখোমুখি বসে 'কথা বলতে হবে' বলে শুরু করার চেয়ে অনেক সহজ। চোখে চোখ রাখার চাপ ছাড়া কথা বলার এই সুযোগটা অনেক বাবা-সন্তান সম্পর্কে আশ্চর্যজনকভাবে কাজে দেয়।
তাহমিনা সরকার প্রকৃতি এখানে একটা সহজ পরামর্শ দেন। 'বাবারা ভাবেন কথা বলা মানে বড় কিছু করতে হবে। আসলে দরকার ছোট জিনিস — প্রশ্ন কমানো, শোনা বাড়ানো। ছেলে কিছু বলতে এলে প্রথম কাজ সমাধান দেওয়া না, চুপ করে শোনা। সমাধান লাগলে সে নিজেই চাইবে।'
ভুল স্বীকার করার অভ্যাসটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাবা যদি কোনো একদিন বলেন, 'তখন রেগে গিয়ে যা বলেছিলাম, ঠিক করিনি' — এই একটা বাক্য বছরের পর বছরের জমে থাকা দূরত্ব অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। সন্তান তখন বুঝতে পারে, বাবাও মানুষ, তিনিও ভুল করেন, এবং সেই ভুল স্বীকার করার সাহসও তার আছে।
আনুষ্ঠানিকতাহীন ছোট মুহূর্তগুলোও গুরুত্বপূর্ণ — একসঙ্গে চা খাওয়া, খেলা দেখা, বাজারে যাওয়া। গভীর কথা প্রায়ই এই সাধারণ মুহূর্তগুলোতেই বেরিয়ে আসে, পরিকল্পিত কোনো 'সিরিয়াস আলোচনা'-তে না। 'কেমন আছ' জিজ্ঞেস করার চেয়ে 'আজকে কী হলো' জিজ্ঞেস করাটা সহজ, আর কার্যকরও বেশি।
আর তাৎক্ষণিক বিচার এড়িয়ে যাওয়া — এটা শেষ কিন্তু সবচেয়ে কঠিন অভ্যাস। সন্তান এমন কিছু বললে যা পছন্দ না, তখন সরাসরি রায় দেওয়ার বদলে জিজ্ঞেস করা, 'তুমি কেন এভাবে দেখছ এটাকে' — সম্পর্কের দরজাটা খোলা রাখে আরেকটু বেশি দিনের জন্য।
যেখানে বাবারা আটকে যান
অনেক বাবা মনে করেন সন্তানের আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়াই তার দায়িত্ব, আবেগের জায়গাটা মায়ের কাজ। এই ভাগটা একসময় চলত। এখনকার কিশোরদের জন্য এটা আর যথেষ্ট নয়। তাহমিনা সরকার প্রকৃতি বলেন, 'উপস্থিতি মানে শুধু মাথার ওপর ছাদ আর খাবার দেওয়া নয়। উপস্থিতি মানে সন্তানের কথা শোনার জন্য সময় বের করা — বিচার ছাড়াই।'
ছোট জায়গা থেকেই শুরু হয় দূরত্ব ভাঙা
কোনো এক রাতে হঠাৎ সব বদলে যাবে না। সম্পর্কটা একদিনে ভাঙেনি, একদিনে গড়েও উঠবে না। কিন্তু একটা ফোনকল যেখানে বাবা শুধু শোনেন, একটা সন্ধ্যা যেখানে কোনো প্রশ্ন না করেই একসঙ্গে বসে থাকা হয়, একটা মুহূর্ত যেখানে বাবা বলে ফেলেন 'আমি ভুল ছিলাম' — এই রকম ছোট ছোট জায়গা থেকেই সেতুটা গড়ে উঠতে শুরু করে।
করিডোরটা একদিন ছোট হয়ে আসবে, দরজাগুলো খোলা থাকবে। তবে প্রথম পা বাড়াতে হয় প্রায়ই বাবাকেই — ভয়টা যেখানে শুরু হয়েছিল, সারিয়ে তোলার শুরুটাও সেখান থেকেই হওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: পাবমেড সেন্ট্রাল (ন্যাশনাল ইন্সটিটিউটস অব হেলথ, যুক্তরাষ্ট্র), সায়েন্স ডিরেক্ট


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.