'আর মাত্র পাঁচ মিনিট': কেন সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা থামানো এত কঠিন?

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

প্রকাশ :

সংশোধিত :

"আর মাত্র পাঁচ মিনিট।" রাতে বিছানায় শুয়ে ফোন হাতে নেয়ার সময় নিজেকে হয়তো ঠিক এই কথাটাই বলেন। তারপর একটি রিল, আরেকটি ভিডিও, একটি মিম, কারও ভ্রমণের ছবি, কারও বিয়ের অ্যালবাম, কারও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। হঠাৎ খেয়াল করে দেখা যায়, পাঁচ মিনিট নয়, পেরিয়ে গেছে প্রায় একটা ঘণ্টা। এমনটা কি শুধু আপনার সঙ্গেই ঘটে? হয়তো না।

বাসে বসে, অফিসের ফাঁকে, ক্লাসের বিরতিতে, কিংবা ঘুমানোর ঠিক আগে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা এখন অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। কখনো খবরের জন্য, কখনো বিনোদনের জন্য, কখনো আবার কোনো কারণ ছাড়াই। আঙুল শুধু ওপরে ওঠে, পর্দার ছবিগুলো বদলাতে থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, থামতে এত কষ্ট হয় কেন?

একসময় অপেক্ষারও একটা সৌন্দর্য ছিল। প্রিয় শিল্পীর নতুন গান শুনতে অপেক্ষা করতে হতো। মাস শেষে পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাসের পরবর্তী কিস্তি পড়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এমনকি বন্ধুর খবর জানতেও কখনো কখনো কয়েকদিন কেটে যেত। আজ অপেক্ষা প্রায় বিলুপ্ত একটি অভিজ্ঞতা।

সবকিছু এখন হাতের মুঠোয়। এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পরের জিনিসটি কী আসছে, আমরা তা জানি না। সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই।

একটি ভিডিওর পর আরেকটি ভিডিও। একটি পোস্টের পর আরেকটি পোস্ট। পরের মুহূর্তে কী দেখতে পাবেন, সেটি আপনি জানেন না। হতে পারে সেটি হাসাবে বা অবাক করবে কিংবা রাগিয়ে দেবে। এই অনিশ্চয়তাই মানুষকে আটকে রাখে।

মজার ব্যাপার হলো, এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। অনেকটা পুরোনো দিনের লটারি টিকিট কিংবা মেলায় বসানো ভাগ্যপরীক্ষার চাকার মতো। কখন পুরস্কার মিলবে, তা জানা নেই। কিন্তু সম্ভাবনা আছে। তাই মানুষ আরেকবার চেষ্টা করে, করতেই থাকে।

তবে শুধু কৌতূহলই নয়, এখানে জড়িয়ে আছে আরেকটি বিষয় মানুষের সহজাত সামাজিকতা।

মানুষ মূলত গল্পপ্রিয় প্রাণী। অন্যের জীবন সম্পর্কে জানতে, অন্যকে নিজের জীবন দেখাতে আমাদের আগ্রহ বহু পুরোনো।

আগে পাড়ার আড্ডা ছিল, চায়ের দোকান ছিল, বিকেলের মাঠ ছিল। এখন সেই জায়গার বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা এক্স। কেউ ঘুরতে গেছেন। কেউ নতুন চাকরি পেয়েছেন। কেউ নতুন বই কিনেছেন। কেউ বৃষ্টির ছবি পোস্ট করেছেন।

এগুলো হয়তো খুব বড় কোনো ঘটনা নয়। তবুও আমরা দেখি। কারণ, আমরা মানুষ।

তবে এখানেই একটি ছোট্ট ফাঁদও আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা সাধারণত মানুষের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশগুলোই দেখি। উৎসব দেখি, অর্জন দেখি, হাসিমুখ দেখি। কিন্তু উদ্বেগ, একাকিত্ব, ব্যর্থতা কিংবা কান্নার মুহূর্তগুলো খুব কমই এখানে দেখা যায়। ফলে অনেক সময় অজান্তেই নিজের জীবনের সঙ্গে অন্যের সাজানো জীবনের তুলনা শুরু হয়ে যায়। তবুও আমরা স্ক্রল করা যেন থামে না।

তাহলে কি এর কোনো উপায় নেই?

আছে। তবে সেটি হয়তো ফোন ভেঙে ফেলা বা সব অ্যাপ মুছে দেওয়ার মতো নাটকীয় কিছু নয়।

অনেকে এখন নিজেদের জন্য ছোট ছোট নিয়ম তৈরি করছেন। কেউ ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রেখে দেয় আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখেন। আবার কেউ কেউ সপ্তাহে একটি দিন ডিজিটাল বিরতি নেয়ারও চেষ্টা করেন।

মজার বিষয় হলো, যারা এমনটা করেন, তারা প্রায়ই একটি বিষয় খেয়াল করেন। ফোনটা হাতে নেয়ার তাগিদ কমলে হঠাৎ করে সময় যেন একটু ধীরে চলতে শুরু করে।

যে বইটি অনেকদিন ধরে পড়ে শেষ করা হয়নি, সেটি আবার খুলে বসা যায় তখন। যে বন্ধুকে ফোন করার কথা ভাবছিলেন, তাকে ফোন দেয়া যায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিও দেখা যায়।

হয়তো সমস্যাটা পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়া নয়

হয়তো সমস্যাটা এই যে, পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ প্রকৌশলী, ডিজাইনার আর অ্যালগরিদম নির্মাতারা প্রতিদিন এমন একটি পর্দা তৈরি করছেন, যেটি আমাদের মনোযোগ ধরে রাখতে চায়। আর আমরা, মানুষ হিসেবে, নতুন গল্পের প্রতি আমাদের চিরন্তন দুর্বলতা নিয়ে সেই পর্দার সামনে বসে থাকি।

সত্যি বলতে কী, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের বন্দি করে রাখে না। বরং সে আমাদের সবচেয়ে পুরোনো কয়েকটি মানবিক প্রবৃত্তিকেই খুব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে কৌতূহল, সংযোগের আকাঙ্ক্ষা, স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছা এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দ।

তাই স্ক্রল থামানো কঠিন।

যেমন কঠিন ছিল ছোটবেলার প্রিয় গল্পের বইয়ের শেষ অধ্যায় না পড়ে রেখে দেওয়া। যেমন কঠিন ছিল মাঝরাতে রেডিওর শেষ গানটি না শুনে ঘুমিয়ে পড়া। পার্থক্য শুধু একটাই। গল্পের বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার যেন কোনো শেষ নেই।

nahida.deepti003@gmail.com

সর্বশেষ খবর