আলাউদ্দীন আলী ও তার সুরের জাদু 

প্রকাশ :

সংশোধিত :

ছিলেন গুণী সঙ্গীত পরিচালক শহিদ আলতাফ মাহমুদের (১৯৩৩-৭১) সহকারী৷ সঙ্গীত পরিচালনার কাজটা হাতে-কলমে শিখেছিলেন তার কাছ থেকেই। এরপর নিজেও সুরারোপ করেছেন অগণিত গানে। তিনি আলাউদ্দীন আলী। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক। তার গানে মেলোডি পৌঁছেছিল অনন্য এক উচ্চতায়। 

আলাউদ্দিন আলী ১৯৫২ সালের ২৪শে ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ী থানার বাঁশবাড়ী গ্রামের এক সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জাবেদ আলী ও মাতার নাম জোহরা খাতুন। দেড় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে। তার পিতা ওস্তাদ জাবেদ আলী ও ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে প্রথম সঙ্গীতে শিক্ষা নেন।

বেহালা বাজাতে গিয়েই  চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে পড়েন আলাউদ্দিন আলী। তিনি বেতারের শিশুদের অনুষ্ঠানে বেহালাবাদক ছিলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি যন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র জগতে আসেন এবং আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে যোগ দেন।

এরপর তিনি  আনোয়ার পারভেজসহ বিভিন্ন সুরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। আলাউদ্দীন আলীর সুরারোপিত অসংখ্য জনপ্রিয় গান আছে। এই গানগুলোয় যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্মণীয়, তা হলো তার অনবদ্য মিউজিক অ্যাকোম্পানিমেন্ট৷ যেমন- তার সুবিখ্যাত কম্পোজিশন 'যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়' এর কথাই ধরা যাক।

তিনি এখানে গানের কথার সাথে মিউজিককে সুনিপুণভাবে মিলিয়েছেন, যা তৈরি করেছে নিখুঁত অণুরণন। এই ব্যাপারটা আমরা সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্তের মতো বিখ্যাত সুরকারদের গানে দেখতে পাই। বাংলাদেশে আলাউদ্দীন আলী এই ব্যাপারটি তার গানে নিয়মিত করে তুলেছিলেন। 

'রাঙামাটির রঙে চোখ জুড়ালো'-র মতো চমৎকার পাহাড়ি সুরের গান যেমন তিনি করেছেন, তেমনি করেছেন 'আছেন আমার মোক্তার' এর মতো লোকজ সুর প্রভাবিত গান।

তবে আলাউদ্দীন আলী ওয়েস্টার্ন ধাঁচের ক্লাসিকাল সুরে সবচেয়ে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছিলেন। 'শেষ করো না শুরুতে খেলা', 'যেভাবেই বাঁচি, বেঁচে তো আছি', 'সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী'-র মতো গানগুলো তার প্রমাণ।

'এমনও তো প্রেম হয়'-এর মতো দেশি স্বাদের কালজয়ী  মেলোডিও তৈরি করেছেন তিনি। এক্ষেত্রে স্মরণ করা যায় 'একবার যদি কেউ ভালোবাসত', 'ভালোবাসা যত বড় জীবন তত বড় নয়' কিংবা 'পৃথিবীতে সুখ বলে যদি কিছু থেকে থাকে'-র মতো মনকাড়া মেলোডিগুলোকে।  

আবার, নব্বই দশকে ব্যান্ড মিউজিকের ফ্লেভারে তৈরি 'তোমাকে দেখলে একবার মরিতে পারি শতবার' কিংবা 'সাগরিকা বেঁচে আছি তোমারি ভালোবাসায়' এর মতো গানেরও সুরকার তিনি। 

সিনেমার বাইরে মিক্সড অ্যালবামের জন্যও গান সুর করেছেন তিনি। 'দিন কি রাতে' গানটি এক্ষেত্রে খুব ভালো উদাহরণ। এটি তার করা সবচেয়ে সেরা কম্পোজিশনগুলোর একটা, যা খুব সিনেম্যাটিক, কিন্তু কোনো সিনেমায় ব্যবহৃত হয়নি। আবার, আশির দশকে করা 'হারানো দিনের মতো হারিয়ে গেছ তুমি'-ও এক্ষেত্রে খুব ভালো উদাহরণ। এটি তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কম্পোজিশন।

দেশাত্মবোধক গানেও তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। 'প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ' কিংবা 'সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি'- র মতো গানগুলো এর উজ্জ্বল সাক্ষর বহন করছে৷ এক্ষেত্রেও তার কম্পোজিশনে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল ধাঁচের দক্ষ প্রয়োগ দেখা যায়। 

তার গানের কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে আসে আরেকটি গানের কথা- 'আমার মত এত সুখী নয়ত কারো জীবন।' নব্বই দশকে যখন সিনেমার গানে মেলোডি আগের তুলনায় কমে আসছে, সে সময় তার এই গান পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। 

এমন আরো অনেক কালোত্তীর্ণ গানের সুরকার আলাউদ্দীন আলী। গানের কথার সাথে নানা রকম বাদ্যযন্ত্রের যে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন তিনি তৈরি করেছেন তার গানে, তা বাংলাদেশের সঙ্গীতজগতে তাকে বিশিষ্ট স্থান দিয়েছে। তাকে 'বাংলাদেশের সলিল চৌধুরী' বললেও অত্যুক্তি হবে না। 

২০২০ সালের ৯ আগস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা। অনবদ্য সব গানের মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন শ্রোতাদের হৃদয়ে।

mahmudnewaz939@gmail.com

সর্বশেষ খবর