
প্রকাশ :
সংশোধিত :

নবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পশ্চিমে দোহার-নবাবগঞ্জ সড়কের দক্ষিণে ইমামনগর সেতুর দক্ষিণ পাশে আছে অদ্ভুতদর্শন এক দেবতার থান। নিশকাইন্দা নামে পরিচিত এই দেবতা। দোহার যেতে দূর থেকে সেতুর পাশে পাকুড়গাছের মাথায় তুলে রাখা লাল নিশান চোখে পড়ে। কৌতূহলী হয়ে সেখানে গেলেই গাছতলায় নিশকাইন্দার অদ্ভুত দর্শন মূর্তির দেখা পাওয়া যাবে। সচরাচর যেমন দেবদেবীর মূর্তি দেখা যায় নিশকাইন্দার মূর্তি তার চেয়ে একেবারেই আলাদা।
মাটির শরীরে দেবতার রূপ
কোনও বেদি বা মন্দির, এমনকি কোনও ছাউনিও নেই। খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর ঢিবির মতো করে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা বিশাল আকারের এক চতুষ্পদ প্রাণীর আকৃতি তৈরি করা। লম্বা প্রায় ৩০ ফুট, উচ্চতা ৬ ফুটের কাছাকাছি। মাথা উত্তরে, অনেকটা ত্রিভুজ আকারের। চোখ, মুখ স্পষ্ট কোনও কিছু নেই। সামনের দিকে সিঁদুর মাখানো একটি কাঠের গজাল পোঁতা। তার দুই পাশে মাটি দিয়েই দুটো করে এবং মাঝখানে একটি রিং তৈরি করা। তাতে লাল হলুদ রং করা। মাঝের রিংটিতে একটি শুকনা গাঁদা ফুলের মালা জড়ানো। এগুলোই সম্ভবত চোখ–নাকের আভাস। পিঠের ওপর ভাগ সমতল। সেখানেও কয়েকটি লাল হলুদ ফুটকি আর রেখা টানা। চারদিকে ছাড়িয়ে রাখা হাত-পায়েও লাল-হলুদ রঙের মাটির বালা পরানো।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান
একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে, নিশকাইন্দা উবু হয়ে শুয়ে আছে, চার হাত-পা চারদিকে ছড়িয়ে। তার পেছনের অংশে লেজের মতো করে গজিয়ে ওঠা পাকুড়গাছ ডালপালা মেলে ছায়া দিচ্ছে শরীরের খানিকটা অংশে। ডাল–পাতার ফাঁক গলিয়ে আসা শীতকালের নরম রোদ আর ছায়া ছক কেটেছে নিশকাইন্দার পিঠে। পূর্বদিকে আছে ছোট আকারের তুলসী মঞ্চ। সেখানে আধপোড়া মোমবাতি আর কিছু চিনির বাতাসা রাখা। পিঁপড়ার দল সারি বেঁধে এসে ভোগে বসে গেছে। বেশ নিরিবিলি পরিবেশ।
শতাব্দীপ্রাচীন সেবার ধারাবাহিকতা
নিশকাইন্দার মূর্তির অদূরে ছোট আকারের একটি মন্দির। সেখানকার লোহার কেচিগেটটি তালা দেওয়া। ভেতরে সিংহবাহিনী দেবীমূর্তি।
সেখানকার সেবাইতের নাম আনন্দ সরকার। নবাবগঞ্জের মাঝিরকান্দা বাজারে ‘জয় স্টোর’ নামে মুদিখানা ও হালকা খাবারের দোকান আছে তার।
বহু শতাব্দী ধরে নবাবগঞ্জের এই নিশকাইন্দার পূজা চলছে বলে জানান আনন্দ সরকার। বংশপরম্পরায় তারা এই দেবতার সেবাইত। নিশকাইন্দা আসলে ভূতদেবতা। দেবাদিদেব মহাদেব কোনও এক কালে নিশকাইন্দা রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মূর্তিটি অনেকটা সিংহের আকৃতির।
চড়ক পূজার সময় নিশকাইন্দার পূজা হয়। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির দিনে পূজা শুরু হয়, তিন দিন ধরে চলে। পূজা উপলক্ষে এখানে অনেক বড় মেলা বসে। বিচারগানের আসর হয়। প্রতিদিন রাতে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া সারা বছর রোজ সন্ধ্যায় নিশকাইন্দার থানে মোমবাতি জ্বালানো এবং বাতাসার ভোগ দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে,নিশকাইন্দা এই এলাকার ঐতিহ্য।
নিশিকান্ত থেকে নিশকাইন্দা
নিশকাইন্দা সম্পর্কে একটু বিশদ তথ্যের জন্য ঘাঁটাঘাঁটি করে জানা যায়, এটি একটি অপদেবতা। ঢাকার দোহার, নবাবগঞ্জ এবং ধামরাইয়ের কিছু এলাকায় নিশকাইন্দার পূজা হয়। কলকাতার খড়ি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত মৃগাঙ্ক চক্রবর্তীর ‘বাংলার দেবতা, অপদেবতা ও লোকদেবতা’ বইটিতে নিশকাইন্দার কাছাকাছি আরেকটি ভূতদেবতার উল্লেখ পাওয়া যায় ‘নিশিকান্ত’ নামে।
এটিও স্থানীয় অপদেবতা। নদীয়া জেলার ফুলিয়া গ্রামে এই নিশিকান্তের থান। তবে আদিতে নিশিকান্তর পূজা হতো বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার বামনকুইটা গ্রামে। সেই গ্রামের বসাক পরিবার কয়েক শতাব্দী ধরে ভূতদেবতা নিশিকান্তের পূজা করতেন। দেশভাগের পর তারা নদীয়া চলে যান। সেখানে গিয়ে নিশিকান্তের পূজার প্রচলন করেন। নদীয়ার নিশিকান্তের মূর্তির ছবির সঙ্গে অনেকটাই মিল আছে নবাবগঞ্জের নিশকাইন্দার মূর্তির। যেমন মিল রয়েছে উভয়ের নামেরও। মূলত নিশিকান্তেরই অপভ্রংশ হলো নিশকাইন্দা।
লোকজ বিশ্বাস ও পরম্পরা
নিশকাইন্দার সঙ্গে শিবের সম্পর্কের কথা লোকমুখে প্রচলিত থাকলেও শাস্ত্রজ্ঞরা বলেছেন ভূতপূজার সঙ্গে আসলে মহাদেব শিবের কোনও সম্পর্ক নেই। বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্বে) নিহাররঞ্জন রায় লোক দেবদেবীর পূজা সম্পর্ক বলেছেন যে, প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার অনেক এলাকাতেই স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দেবদেবী, গাছ, প্রাণী এসবের পূজার প্রচলন ছিল। এসবের কিছু লুপ্ত হয়েছে, কিছু রূপান্তরিত হয়েছে, কিছু বৈদিক দেবতার মর্যাদাও লাভ করেছে। ফলে অনুমান করা যাচ্ছে নবাবগঞ্জের নিশকাইন্দা বিলুপ্তির কবল থেকে টিকে যাওয়া এমনই এক প্রাচীন স্থানীয় লোকদেবতা। ভূতের ভয় সাহসীদেরও কিছু আছে। তাই ভয়ে ভক্তিতে এখনও পূজিত হয়ে আসছে নবাবগঞ্জের ভূতদেবতা 'নিশকাইন্দা।'
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.