চিরতরুণ সেবা প্রকাশনী ও চিরঋণী কয়েক প্রজন্ম

প্রকাশ :
সংশোধিত :

একটা সময় ছিল, যখন বইয়ের দোকানের কাঠের তাকে দাঁড়িয়ে থাকা রঙিন মোড়কের বই মানেই এক ধরনের উত্তেজনা। হাত বাড়ালেই যেন রহস্যের দরজা খুলে যেত। কুয়াশা ভেজা কোনো শহর, অজানা এক এজেন্টের নাম, কিংবা তিন কিশোরের গোয়েন্দা অভিযান, এসব মিলিয়ে একটা আলাদা পৃথিবী। সেই পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত নাম ছিল সেবা প্রকাশনী।
আজ যখন সেই নামটা অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, তখন আসলে প্রশ্নটা শুধু একটি প্রকাশনীর ভবিষ্যৎ নয় আমাদের পাঠ-স্মৃতির ভবিষ্যৎ নিয়েও।
শুরুটা ছিল এক নতুন কল্পনার দরজা
১৯৬৪ সালে কুয়াশা সিরিজ দিয়ে সেবার যাত্রা শুরু। তখন কেউ হয়তো ভাবেনি, এটা শুধু বই প্রকাশের উদ্যোগ থাকবে না, এটা হয়ে উঠবে এক প্রজন্মের কল্পনার দরজা। রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার, দ্রুত গতি, সব মিলিয়ে একটা নতুন ধাঁচ তৈরি হলো।
এরপর ১৯৬৬ সালে এলো মাসুদ রানা সিরিজ। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য এটা ছিল প্রায় সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, গুপ্তচর জগৎ, গোপন মিশন, সবকিছুই বাংলা ভাষায়, খুব কাছের করে।
এই জায়গাটাতেই সেবা একটা কাজ করেছিল-বিশ্বকে ছোট করে এনে বইয়ের পাতায় বসিয়ে দেওয়া। দূরের ঘটনাগুলোকে এমনভাবে হাজির করা, যেন সেগুলো আমাদের পাশের শহরেই ঘটছে।
কৈশোরের রহস্য আর অভিযান
আমাদের অনেকের কৈশোর কেটেছে এক অদ্ভুত ত্রয়ীর সঙ্গে যেখানে ছিল রহস্য, বন্ধুত্ব, অভিযান, নাম তার তিন গোয়েন্দা সিরিজ।
স্কুল শেষে ব্যাগ রেখে বই হাতে নিয়ে বসে যাওয়া এটা ছিল এক রুটিন স্বপ্ন। কোথাও একটা গোপন রহস্য আছে, আর আমরা সেটার অংশ।
এই সিরিজের মাধ্যমে অনেকেই প্রথমবার নিজের থেকে বই শেষ করার আনন্দ পেয়েছে। ছোট ছোট রহস্য, দ্রুত গতি, আর বন্ধুত্বের ভেতর দিয়ে গল্প এগিয়ে যাওয়া, এই সবকিছু কিশোরদের জন্য এক ধরনের জীবন্ত জগৎ তৈরি করেছিল।
এর পাশাপাশি বুনো পশ্চিমের কাহিনী নিয়ে ১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া ওয়েস্টার্ন সিরিজও আশির দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মরুভূমির ধুলো, কাউবয়দের দ্বন্দ্ব, বন্দুকের শব্দ; বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের কল্পনায় ঢুকে যায়। আবার নব্বইয়ের দশকে ১৯৯২ সালে আসে সেবা রোমান্টিক সিরিজ, যেখানে সম্পর্ক, আবেগ আর অনুভূতির গল্পগুলো নতুনভাবে ধরা দেয়।
পপ সংস্কৃতির নীরব নির্মাতা
স্কুলের আড্ডায় কোন সংখ্যা পড়া হয়েছে, কে নতুন মাসুদ রানা শেষ করেছে, কোন তিন গোয়েন্দার কাহিনি সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল এসব নিয়ে চলতো দৈনন্দিন আড্ডা।
বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা, নতুন বই আসার অপেক্ষা, আর বই হাতে পাওয়ার সেই আনন্দ, সবকিছু মিলিয়ে একটা সামাজিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল।
সেবার বইগুলোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত গতি যা সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্ক করা যায়। কেউ বলেন এতে মূল সাহিত্যকর্মের গভীরতা কমে যায়, কেউ বলেন এটা পাঠক তৈরি করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বইগুলোই অনেককে প্রথমবার বই পড়ার অভ্যাসে নিয়ে এসেছে।
থেমে যাওয়া সময় আর ফিরে আসার অপেক্ষা
আজকের দিনে পাঠাভ্যাস বদলে গেছে। মানুষ এখন দ্রুত কনটেন্টে অভ্যস্ত, ভিডিও আর ছোট তথ্যের ভেতর দিয়ে সময় কাটে। বই পড়া অনেকের কাছে ধীর হয়ে গেছে।
তবুও সেবা এখনো বেঁচে আছে স্মৃতিতে। পুরনো বইয়ের মোড়ক, পরিচিত নাম, কিংবা কুয়াশা বা মাসুদ রানা সিরিজের কথা শুনলেই একটা সময় ফিরে আসে।
সম্প্রতি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সেবার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিতের কথা শোনা যাচ্ছে। অডিট শেষে আবার প্রকাশনা শুরু হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই খবরের বাইরে একটা বড় অনুভূতি কাজ করে। এটা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের থেমে যাওয়া নয়, বরং একটা দীর্ঘ পাঠ-সংস্কৃতির হঠাৎ নীরব হয়ে যাওয়া। এই নীরবতা অনেকের কাছে ব্যক্তিগতও। কারণ সেবা শুধু বই ছিল না, এটা ছিল শৈশব, কৈশোর আর কল্পনার একটা অংশ।
mahmudnewaz939@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.