ভারত–ইইউ বাণিজ্য চুক্তি: বিশ্ববাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় দেশীয় পোশাক শিল্প

প্রকাশ :
সংশোধিত :

ভারতের সাথে আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এক তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে যাচ্ছে।
আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত ভারতীয় পণ্যের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১৮ শতাংশ করার ঘোষণা এসেছে। যেখানে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রায় ২০ শতাংশ শুল্ক বহাল রয়েছে, সেখানে ভারতের এই সুবিধা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধরে রাখা এখন সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হলে দেশের ভেতরের সরবরাহ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে। তাঁদের প্রস্তাবিত করণীয়গুলোর মধ্যে রয়েছে: বাণিজ্য নীতি সংস্কার, জ্বালানি মূল্য ও সরবরাহের স্থিতিশীলতা, লজিস্টিকস ও বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজ শর্তে অর্থায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এছাড়া পণ্যের বৈচিত্র্য আনা, বিশেষ করে ম্যানমেড ফাইবার ভিত্তিক পোশাক উৎপাদন এবং নতুন, অপ্রচলিত বাজার অনুসন্ধানের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এদিকে ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই চুক্তির ফলে ভারত ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ এই সুবিধা পেলেও ২০২৯ সালের পর তা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাবে। এর ফলে ২০২৯ সালের পর ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা শেষ হবে এবং প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক গুণতে হতে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের এই প্রধান খাতকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্টরা কিছু জরুরি পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি মো. শিহাব চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের শুল্ক ১৮ শতাংশে নেমে আসায় বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়বে, যেখানে বাংলাদেশের শুল্ক ২০ শতাংশ। তিনি বলেন, ইইউ–ভারত চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। বাজারে অংশীদারিত্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া গার্মেন্ট শিল্প উদ্যোক্তা ফারুক হাসান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের প্রভাব সামাল দিতে ভারত ও চীন ইইউ বাজারে আরও বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে সেখানে প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ এম এ রাজ্জাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের শুল্ক কমলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের ওপর বড় প্রভাব পড়বে না। তবে আগামী ৩–৫ বছরের মধ্যে ইইউ–ভারত চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, ভারতের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ রয়েছে—নিজস্ব তুলা, সুতা ও কাপড় উৎপাদন সক্ষমতা। বিপরীতে বাংলাদেশকে কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে অবিলম্বে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আলোচনার নির্দেশ দিয়েছেন—যাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে শুল্ক সুবিধা রক্ষা করা যায়।
এছাড়া গ্যাস ও জ্বালানি সংকট দূর করা, লজিস্টিক ও বন্দর সুবিধার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ খরচ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ ব্যাংক সুদের হার এবং ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করা।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের চাহিদা বেশি। তাই সুতি কাপড়ের বাইরে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
গতানুগতিক আমেরিকা বা ইউরোপের বাজারের বাইরে নতুন ও অপ্রচলিত বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়ানো।
গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশই ছিল ৫০ শতাংশের বেশি—প্রায় ১৯ দশমিক ৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.