রাজস্ব বাড়াতে করের পরিধি বিস্তারে উদ্যোগ

সম্পত্তি কর চালুর কথা ভাবছে এনবিআর

প্রকাশ :

সংশোধিত :

আগামী অর্থবছরে সীমিত পরিসরে সম্পত্তি কর চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকারের রাজস্ব বিভাগ। এর মাধ্যমে ধনী ব্যক্তিদের ধীরে ধীরে বৃহত্তর কর-জালের আওতায় আনা হবে।

প্রস্তাবিত এই সম্পত্তি কর ব্যবস্থা বর্তমানে বিদ্যমান সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থার পরিবর্তে চালু হতে পারে, কারণ বিদ্যমান ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ও কম দেখানো সম্পদের ওপর কর আদায়ে কার্যকর হয়নি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবটি বর্তমানে একটি বিশেষ কমিটির সক্রিয় পর্যালোচনায় রয়েছে।

এই প্যানেল তিনটি সম্ভাব্য মডেল প্রস্তুত করছে, যা আগামী ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে জমা দেওয়া হবে।

দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে ওই কর্মকর্তা বলেন, “প্রাথমিকভাবে, এই কর করদাতার প্রধান বাসস্থানের ওপর প্রযোজ্য নাও হতে পারে। এছাড়া দ্বিতীয় বাসস্থান যদি ভাড়া দেওয়া হয় এবং সেটিই ব্যক্তির একমাত্র আয়ের উৎস হয়, সেটিও ছাড় পেতে পারে।” 

তিনি আরও জানান, রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগকে আলাদা কোনো মূল্যায়ন বিভাগ গঠন করতে নাও হতে পারে, কারণ বাজারমূল্যের ভিত্তিতেই এই কর আরোপ করা হতে পারে।

এনবিআর ইতোমধ্যে একটি “সম্পদ কর আইন” খসড়া করা শুরু করেছে, যা আগামী বাজেট অধিবেশনে সংসদে উপস্থাপন করা হতে পারে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও বারিধারা এবং চট্টগ্রামের খুলশী ও আগ্রাবাদসহ বিভাগীয় শহরের অভিজাত এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে।

বর্তমান আয়কর কাঠামো অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মোট সম্পদ স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে (যেমন বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ও জমি) ৪ কোটি টাকা অতিক্রম করলে তাকে সারচার্জ দিতে হয়।

এছাড়া কোনো ব্যক্তি একাধিক গাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের বেশি আবাসিক সম্পত্তির মালিক হলে এই সারচার্জ প্রযোজ্য হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সারচার্জ মোট সম্পদের ওপর নয়, বরং প্রদেয় আয়করের ওপর হিসাব করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কারও সম্পদের মূল্য ৫ কোটি টাকা হয় এবং তিনি বছরে ১ লাখ টাকা আয়কর দেন, তাহলে তিনি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সারচার্জ দেবেন, অর্থাৎ ১০ হাজার টাকা।

উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনবিআর সারচার্জ থেকে ২৯৬০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার ০৫৩ জন করদাতা ৭৬ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা সারচার্জ দিয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৮৫৪ জন করদাতা ৬৮ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৯১৯ জন করদাতা ৬৫,৮৯০ কোটি টাকা দিয়েছেন।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, চলতি অর্থবছরে সারচার্জ সংগ্রহ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

অনেক ধনী ব্যক্তি বিশেষ করে উচ্চবিত্ত নগর এলাকাগুলোতে সম্পদের মূল্য কম দেখানোর কারণে কর নেটের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদ ড. জাইদি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন একটি জাতীয় টাস্কফোর্স প্রস্তাব করেছে যে, সম্পত্তি কর ২০৩৫ অর্থবছরের মধ্যে মোট রাজস্ব আয় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে, যা বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান।

তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদ্যমান কর কাঠামো, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন বলে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে সম্পত্তি লেনদেনে একাধিক কর ও ফি প্রযোজ্য রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি, ১ শতাংশ রেজিস্ট্রেশন ফি, ২ শতাংশ পৌরসভা বা ভূমি উন্নয়ন কর, ১ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং বিক্রেতার ওপর মূলধনী মুনাফা কর।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কর ও ফি মিলিয়ে ঘোষিত দলিলমূল্যের ১০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়, ফলে সম্পত্তির মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয় এবং অপ্রকাশিত সম্পদ জমা হয়।

টাস্কফোর্স আরও দেখিয়েছে যে, উপহার, উত্তরাধিকার বা ট্রাস্টের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কোনো কর না থাকাটা একটি বড় অস্বাভাবিকতা, যা প্রজন্মান্তরে সম্পদ স্থানান্তরের প্রধান মাধ্যম।

এই সমস্যা সমাধানে তারা প্রস্তাব করেছে যে, উপহার ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ সম্পত্তি হস্তান্তর কর চালু করা হোক, যা মিউটেশনের সময় আরোপ করা হবে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো সরকারি (মৌজা) মূল্য ও বাস্তব বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান।

কমিটি একটি কেন্দ্রীয় সম্পত্তি ডেটাবেস তৈরির সুপারিশ করেছে, যেখানে বাজারভিত্তিক মূলধন মূল্য ও ভাড়ার আয়ের অনুমান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া প্রতি পাঁচ বছর পরপর জরিপ পরিচালনা এবং সম্পত্তি মালিকানার তথ্য ই-টিআইএন রেকর্ডের সঙ্গে যুক্ত করে যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থায় ধারণাগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে, কারণ এটি প্রকৃত সম্পদের পরিবর্তে আয়করের ওপর নির্ভর করে এবং মূল্যায়ন সক্ষমতা সীমিত।

রাজস্ব কর্মকর্তারা জানান, উন্নত দেশগুলোতে সম্পদ কর প্রচলিত রয়েছে এবং এটি গড়ে তাদের মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্বে অবদান রাখে।

doulotakter11@gmail.com

সর্বশেষ খবর