রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বাণিজ্য কর সংস্কারের সুপারিশ টাস্কফোর্সের

প্রকাশ :

সংশোধিত :

একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি বাংলাদেশের বাণিজ্য করব্যবস্থার আমূল সংস্কারের সুপারিশ করেছে। যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিসহ একটি গতিশীল ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়।

সর্বশেষ অর্থবছরে দেখা গেছে, বাংলাদেশে চূড়ান্ত ভোগ্যপণ্যের ওপর শুল্ক সুরক্ষা মধ্যবর্তী কাঁচামালের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক৷ ৪ গুণ বেশি। এতে দেশের বাণিজ্য কাঠামোয় দীর্ঘদিনের একটি ভারসাম্যহীনতা আরও গভীর হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গড়ে চূড়ান্ত ভোগ্যপণ্যে মোট নামমাত্র সুরক্ষা ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, যেখানে মধ্যবর্তী কাঁচামালের ক্ষেত্রে তা মাত্র ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ২৫ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধান।

উত্তর-উত্থান পরবর্তী সংস্কারমূলক সরকারের উদ্যোগে গঠিত ন্যাশনাল টাস্কফোর্স ফর ট্যাক্স রিফর্মস সুপারিশ করেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট রাজস্বে বাণিজ্য করের অংশ বর্তমান ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার। এটি আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তারা মনে করে।

টাস্কফোর্সের মতে, বাণিজ্য কর কমানো হলে— রপ্তানিবিরোধী পক্ষপাত কমবে, দেশীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হতে পারবে। 

তবে শুল্ক সুরক্ষা কমানো নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক শিল্পোদ্যোক্তার মতে, নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কিছু ক্ষেত্রে সুরক্ষা এখনও প্রয়োজন।

প্রতিবেদনটি চলতি বছরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়। দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এই প্রতিবেদনটির একটি কপি সংগ্রহ করেছে, যদিও এটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি।

একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বড় দ্বন্দ্ব হলো—বাণিজ্য কর অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বিকৃত করগুলোর একটি হলেও, এগুলো সহজে আদায়যোগ্য হওয়ায় সরকার এখনো ব্যাপকভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। এতে দক্ষতা ও প্রশাসনিক বাস্তবতার মধ্যে কঠিন সমঝোতা তৈরি হয়।

কমিটির প্রধান, বাণিজ্য অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি ট্যারিফ এসকেলেশন দেখা যায়।

২০০৪ সালে নির্ধারিত ২৫ শতাংশ সর্বোচ্চ কাস্টমস ডিউটি আজও অপরিবর্তিত রয়েছে, তার ওপর যোগ হয়েছে রেগুলেটরি ডিউটি ও অনেক ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক।

তার মতে, সুরক্ষা কমাতে হলে ইনপুট ও আউটপুট উভয় শুল্কই একসঙ্গে কমাতে হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে চূড়ান্ত পণ্য ও কাঁচামালের গড় শুল্কের ব্যবধান ৫ শতাংশ পয়েন্টের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত, যখন বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চূড়ান্ত পণ্যের শুল্ক বেশি রেখে কাঁচামালের শুল্ক কমানোর কারণে অনেক ভোগ্যপণ্য শিল্পে কার্যকর সুরক্ষা বেড়েছে। এই প্রবণতা রপ্তানিযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি–এর সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য খাতভিত্তিক কৌশল জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, বিস্কুট শিল্পের মতো অনেক খাত সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত চিনি ও গমের ওপর নির্ভরশীল।

অন্যদিকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ–এর মার্কেটিং পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল মনে করেন, সুরক্ষামূলক শুল্কের কারণেই স্থানীয় শিল্পগুলো সম্প্রতি বিকশিত হয়েছে এবং আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

টাস্কফোর্সের চূড়ান্ত মন্তব্য হলো—বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য কর কাঠামো পুরনো, জটিল ও অচল হয়ে পড়েছে।

 “সময় এসেছে একটি মৌলিক ও সাহসী পরিবর্তনের” প্রতিবেদনটি ড. জায়েদি সাত্তারের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা হয়, যেখানে আরও অবদান রেখেছেন ড. এম. জাহিদ হোসেন, ড. সৈয়দ এম. আহসান, ড. সুলতান হাফিজ রহমান, সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, শাহ মো. আবদুল খালেক ও স্নেহাসিস বড়ুয়া।

সবশেষে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—“কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিসহ একটি গতিশীল, রপ্তানিমুখী অর্থনীতি গড়তে বাণিজ্য কর সংস্কার এখন জাতীয় অপরিহার্যতা।”

সর্বশেষ খবর