অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ৬৫ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে ৬৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন করতে গিয়ে আপাতদৃষ্টিতে ৭৯ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
প্রকল্পগুলোর মূল সম্মিলিত প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল দুই লাখ ২৪ হাজার টাকা, যা সংশোধন করে তিন লাখ চার হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এর ফলে সার্বিক ব্যয় বেড়েছে ৩৫দশমিক ৬৭ শতাংশ।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের মেয়াদে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ১৯টি সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের (এফই) অধিকতর বিশ্লেষণে দেখা যায়, একনেক মোট ৮৭টি চলমান প্রকল্প সংশোধন করেছে—যা প্রতি সভায় গড়ে ৪ দশমিক ৫৮টি। সংশোধিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সাতটির ব্যয় ৯৫০ কোটি টাকা কমানো হয়েছে, যা তাদের মূল সম্মিলিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
আরও ১৫টি প্রকল্পের ব্যয় অপরিবর্তিত থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতাভুক্ত প্রকল্পগুলো কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে অন্তর্বর্তী সরকার বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়াবে এবং সরকারি তহবিলের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে—এমন উচ্চ প্রত্যাশা থাকলেও, বারবার প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও, এনইসি ও একনেক পুনর্গঠনের পর সে বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ওই সভায় চারটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়, যার মধ্যে দুটি ছিল সংশোধিত প্রস্তাব। এর মধ্যে চলমান "বাখরাবাদ-মেঘনাঘাট-হরিপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ" প্রকল্পের ব্যয় মূল এক হাজার ৩০৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫৭১ কোটি টাকা করা হয়।
"তথ্য আপা: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটির মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন (২য় পর্যায়)" শীর্ষক আরেকটি প্রকল্পের ব্যয়ও ১৬৩ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
মেয়াদের শেষ পর্যায়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী একনেকে অনুমোদন করে, যার ফলে ব্যয় বেড়ে এক লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
অত্যন্ত বিতর্কিত এই প্রকল্পটি ২০১৬ সালে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রথম অনুমোদিত হয়েছিল। সংশোধনের পর এর ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বা ২২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়েছে।
রাজধানী ঢাকায় মেঘনা নদী থেকে সুপেয় পানি সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প (৩য় পর্যায়)-এর তৃতীয় দফার সংশোধনীও একনেক অনুমোদন করেছে, যার সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা।
ঢাকা ওয়াসা ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা প্রাথমিক ব্যয়ে প্রকল্পটি শুরু করেছিল, যা পরে ১১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা বা ২৪৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন (১ম পর্যায়) প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৪১০ কোটি টাকা এবং জরুরি বহুমুখী রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৩২৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ অনুমোদন করেছে সরকার।
বিতর্কিত উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)-এর ব্যয়ও ৪৮ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা থেকে দুই হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা হয়েছে।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) ছিল একমাত্র মেগা প্রকল্প যার ব্যয় কমানো হয়েছে। এর ব্যয় ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমে যাওয়ায় ৭৫৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
মূলত স্টেশন-প্লাজা উন্নয়ন এবং জমি অধিগ্রহণ সম্পর্কিত এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের বিভিন্ন বিষয় যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে এই সাশ্রয় করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম একনেক সভার প্রধান সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল প্রকল্পের দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং আগে অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর তদারকি জোরদার করা।
সভায় সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়াতে প্রকল্পগুলোর (বিশেষ করে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট) দ্রুত প্রাথমিক যাচাই-বাছাই, ছোট ও উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া, জমি অধিগ্রহণের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছিল।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.