মধ্যপ্রাচ্য সংকট: আরও বাড়তে পারে সুদ-ভর্তুকি-প্রণোদনা ব্যয়

প্রকাশ :
সংশোধিত :

আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে বড় অংশ ব্যয় হতে যাচ্ছে। এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা, যা বাড়তে পারে বিশেষ করে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মোট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ২৭ দশমিক ৮৬ শতাংশই এই খাতে ব্যয় হবে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেশি।
কর্মকর্তারা বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা থাকায় জ্বালানি আমদানি ব্যয় দ্বিগুণ হতে পারে এমন সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকির হিসাব এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে।
এদিকে মূল্যস্ফীতি না কমলে এবং আর্থিক খাতে তারল্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর সুদের চাপ আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
তারা আরও বলেন, যদি বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী “ফ্যামিলি কার্ড” ও “ফার্মার কার্ড” চালু করে, তবে এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হবে।
গত শুক্রবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রাজস্ব, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত সমন্বয় পরিষদের বৈঠকে এসব পূর্বাভাস উঠে আসে।
বৈঠকে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বা ২ লাখ কোটি টাকা।
এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ ৮৪ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ উচ্চ সুদের চাপ কমাতে সরকার ক্রমেই বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের জন্য ২৭ হাজার কোটি টাকা।
তবে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সুদের ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
ভর্তুকি খাতেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি, এলএনজি খাতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি, সার খাতে ২৭ হাজার কোটি এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মোট ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার চেয়ে বেশি।
কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার ফলে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চাপ তৈরি হয়েছে।
কৃষি, রপ্তানি ও পাট খাতে প্রণোদনা অপরিবর্তিত থাকলেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে রেমিট্যান্স প্রণোদনা ৮ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরি বলেন, “সুদ পরিশোধের মতো ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ খুবই সীমিত। তবে ভবিষ্যতে এ খাতে নিয়ন্ত্রণ আনার সুযোগ রয়েছে।”
তিনি বলেন, ভর্তুকি ব্যয় আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে এবং সব খাতে সমানভাবে ভর্তুকি না দিয়ে যেসব খাত সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উপকার করে না, সেসব খাতে ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমানো উচিত। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
Jahid.rn@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.