করের হার নয়, কর আদায় বাড়াতে চায় সরকার: ড. তিতুমীর

প্রকাশ :

সংশোধিত :

সরকার করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি করতে চায় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি বলেন, করের হার এবং কর আদায়ের পরিমাণ—এ দুটি ভিন্ন বিষয়। তাই রাজস্বনীতি নিয়ে আলোচনায় এই পার্থক্যটি সঠিকভাবে তুলে ধরা জরুরি।

আইসিএবি-এফই আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, করের হার বাড়ানো হবে না; তবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের পরিমাণ বাড়ানো হবে। রেট আর অ্যামাউন্ট ঠিকভাবে লিখবেন।”

ড. তিতুমীর বলেন, দেশের কর কাঠামো দুর্বল। বাংলাদেশ এমন একটি কর কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যেখানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

তার মতে, শুধু রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই কর আদায় বাড়ে না; অর্থনীতিকে সচল করতে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

তিনি বলেন, “অর্থনীতি যদি কাজই না করে, তাহলে কর আসবে কীভাবে?”

ড. তিতুমীর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আগের বছরের তুলনায় মোট কর আদায় মাত্র ২ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে। কিন্তু একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, বাস্তবতাকে বিবেচনায় না এনে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কার্যকর নয়। উন্নয়নের একটি ভিশন থাকতে হবে, তবে রাজস্ব আহরণে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

তার ভাষায়, “আমাদের উচ্চ লক্ষ্য রাখতে হবে, ভিশন থাকতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আইএমএফ ৯ দশমিক ২ শতাংশ বলল আর আমরা বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি লক্ষ্য ঠিক করে ফেললাম।”

সরাসরি কর বাড়ানোর একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, কর্মসংস্থান বাড়লে এবং মানুষের আয় করযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছালে সরাসরি কর আদায়ও বাড়বে।

তিনি বলেন, “সরাসরি কর বাড়ানোর একটাই উপায়—কর্মসংস্থান বাড়তে হবে এবং সেই কর্মসংস্থান থেকে এমন আয় তৈরি হতে হবে, যা করযোগ্য।”

ড. তিতুমীর বলেন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো ছাড়া কর আদায় বৃদ্ধি সম্ভব নয়। অর্থনীতির আকার না বাড়লে করভিত্তিও বাড়বে না।

তার মতে, নতুন অর্থনৈতিক মডেলকে পৃষ্ঠপোষকতা, গোষ্ঠীনির্ভরতা ও অলিগার্কিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর পরিবর্তে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে “অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ”। এর ফলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং করযোগ্য আয়ও বৃদ্ধি পাবে।

কর আদায় বাড়াতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। নাগরিকরা যদি বুঝতে পারেন যে তাদের দেওয়া করের বিনিময়ে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন জনসেবা পাচ্ছেন, তাহলে কর দেওয়ার আগ্রহও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ড. তিতুমীর বলেন, আগামী বাজেট থেকে আয়কর রসিদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটের কত শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তার মতে, করদাতাদের শুধু করদায়িত্বসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখলে হবে না; তাদের জানাতে হবে, তাদের করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং কোন প্রতিষ্ঠান তা ব্যবহার করছে।

তিনি বলেন, কর ব্যবস্থায় “কানেক্টিভিটি” ও “ডিসকানেক্টিভিটি”—দুটিই প্রয়োজন। কর কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমানো হবে “ডিসকানেক্টিভিটি”, আর করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে তা জানানো হবে “কানেক্টিভিটি”।

কর আদায় বাড়াতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার ওপরও জোর দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে ক্যাশলেস লেনদেন, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, ওয়ান সিটিজেন-ওয়ান কার্ড এবং ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেটের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ড. তিতুমীর বলেন, সরকারের লক্ষ্য করের হার বাড়ানো নয়; বরং অর্থনীতির পরিধি বাড়ানো, করযোগ্য আয় বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের কর কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানো।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানই বলে দেবে সরকারের কথা ও কাজের মিল কতটা রয়েছে।

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা কর কাঠামো সংস্কার, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

সর্বশেষ খবর