অক্টোবরে আইএমএফ-এর পরবর্তী পর্যালোচনা
কম রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
২০২৫ অর্থবছরে ৭.৬৯%-এ নেমে ৫ বছরের সর্বনিম্ন, ঘাটতি বাড়ছে

প্রকাশ :
সংশোধিত :

অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যবসায়িক স্থবিরতা এবং রাজস্ব আহরণকারী সংস্থাগুলোর অস্থিরতার কারণে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত আরও কমেছে।
এই পরিস্থিতিতে খুব শিগগিরই আইএমএফ-এর পরবর্তী পর্যবেক্ষণ মিশন আসার ঘোষণা নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছর ধরে ৮ দশমিক শূন্য শতাংশের ওপরে ছিল।
সমষ্টিগত রাজস্বের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আহরিত কর এবং নন-এনবিআর রাজস্ব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর-জিডিপি অনুপাতও কমে গেছে ২০২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
তবে, সরকার কিছু ফি ও চার্জে সামান্য সমন্বয় করায় গত অর্থবছরে নন-ট্যাক্স রাজস্ব (এনটিআর) ৩৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
২০২৫ অর্থবছরে এনবিআর, নন-এনবিআর এবং এনটিআর থেকে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৪ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ০২ শতাংশ। অথচ আগের বছর প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশ।
গত অর্থবছরে এনবিআর ও নন-এনবিআর কর আদায় হয়েছে ৩ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন টাকা, প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশ।
কর্তৃপক্ষ বলছে, গত বছর মোট জাতীয় রাজস্বের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে স্থবির ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হচ্ছে।
রাজস্ব বোর্ড কর্মকর্তারা মনে করছেন, কর রাজস্ব আদায়ের এই ধস আইএমএফ-এর পরবর্তী মূল্যায়ন মিশনের সময় সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক এই বৈশ্বিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের একটি দল অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে আসবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি পুনর্মূল্যায়নের জন্য, যা ঋণচুক্তির পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের আগে একটি শর্ত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ অর্থবছরে নন-ট্যাক্স রাজস্ব (এনটিআর) প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে এক লাফে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশে, সরকারের নন-ট্যাক্স ফিসকাল পদক্ষেপের কারণে।
চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬)-এ এনবিআরের জন্য অতিরিক্ত ৪০০ বিলিয়ন টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে আইএমএফ, যা নীতিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে। একই প্রেক্ষাপটে, ২০২৫ অর্থবছরে এনবিআর অতিরিক্ত ১২০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যে ১০০ পণ্যে কর বাড়িয়েছে।
সর্বশেষ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এনবিআরকে আয়কর থেকে ২০০ বিলিয়ন, ভ্যাট থেকে ১৮০ বিলিয়ন এবং কাস্টমস থেকে ২০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করতে হবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফ ঋণচুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৬ অর্থবছরে ০ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানোর শর্ত রয়েছে।
কিন্তু গত বছর কর-জিডিপি অনুপাত উল্টো পথে গেছে শূণ্য দশমিক ৬৯ শতাংশ কমেছে, যদিও ২০২৪ অর্থবছরে তা ০ দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, উন্নয়ন খাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা থেকে আসতে থাকা ঋণ ফাঁদ এড়াতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন জাতীয় অগ্রাধিকার।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “যদি এভাবে রাজস্ব আহরণের ধস চলতে থাকে, বাংলাদেশ ভয়ঙ্কর ঋণ ফাঁদে পড়বে।”
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, “যদিও বলা হচ্ছে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নেই। কারণ এটি নির্ভর করে একটি দেশের ঋণ বহন ক্ষমতার ওপর।”
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুরোপুরি ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে।
এখানে একটি দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, অনুদানভিত্তিক ঋণের তুলনায় উচ্চসুদের ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে এবং ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড কমে আসছে।
তিনি বলেন, “আমরা যদি দেশীয় রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারি, তাহলে বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সংকট দেখা দিতে পারে।”
এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দুর্বল দেশীয় রাজস্ব আহরণ বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি মন্তব্য করেন, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিবর্তে উল্টো ফল দিয়েছে।
doulotakter11@gmail.com


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.